শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৪৮ অপরাহ্ন

বিদেশে চিকিৎসার সিংহভাগ অর্থই যাচ্ছে অবৈধ পথে

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়। এ কারণে বছরে ৪০০-৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার দেশের বাইরে চলে যায়, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। কিন্তু বৈধ পথে এই বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি হচ্ছে না। এসংক্রান্ত নীতিমালার জটিলতার কারণে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থই হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক উপায়ে দেশের বাইরে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ ও যৌক্তিকীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। এতে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রার বহির্গমন অনেকটাই নিরুৎসাহ হবে বলে মনে করেন তাঁরা। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই চিন্তা করছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বছরে দেশ থেকে ঠিক কতজন রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায় এবং এ বাবদ কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।

তবে এর একটি ধারণা পাওয়া যায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রাক্কলন থেকে, যা ২০১২ সালে করা হয়েছিল। বিডার ওই প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১২ সালে ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে এক লাখ ২৮ হাজার রোগীর চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয়েছিল ২০৪ কোটি ডলার, যা ওই সময়ের জিডিপির ১.৯৪ শতাংশ ছিল।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ। তাদের চিকিৎসা ব্যয় বছরে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার, যা জিডিপির প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ।

সূত্র বলছে, চিকিৎসা কোটায়  বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও নীতিমালার এই শর্তের কারণে রোগীরা এতে আগ্রহ দেখায় না। বেসরকারি সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার শাখায় কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংক শাখার কর্মকর্তারা জানান, এ কোটায় বৈদেশিক মুদ্রা নিতে তেমন আগ্রহ দেখায় না মানুষ। আবার কেউ আগ্রহ দেখালেও শর্ত পূরণ করতে পারে না।

জানা যায়, ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে এখন আর মেডিক্যাল ভিসার জন্য সরকারি মেডিক্যাল বোর্ড বা স্থানীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুপারিশ প্রয়োজন হয় না। ফলে রোগীরাও বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা নিতে আগ্রহী হয় না। সে কারণে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে হুন্ডি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের প্রবণতাও বাড়ছে। এ ছাড়া অনেকেই ভ্রমণ কোটায় বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে চিকিৎসায় খরচ করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু বিদেশে চিকিৎসার ভিসা পেতে এই দুটি শর্ত পূরণের প্রয়োজন হচ্ছে না, তাই নীতিমালায় এগুলো রাখার যৌক্তিকতা আছে কি না, সেটি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসা বাবদ বিদেশে ডলার নিতে কিছু প্রক্রিয়া আছে। নীতিমালায়ই এ বিষয়ে বলা আছে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে ব্যাংকগুলো অবশ্যই ডলার ছাড় করতে চাইবে না। সরকারি মেডিক্যাল বোর্ড বা স্থানীয় চিকিৎসকের সুপারিশ পাওয়াও একটা জটিল বিষয়। তাই এগুলো উঠিয়ে দেওয়াই ভালো। এতে মানুষ বৈধ পথে ডলার নিতে আগ্রহী হবে।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে চিকিৎসার সুপারিশসংবলিত প্রত্যয়নপত্র পাওয়া জটিল একটা বিষয়। এ ধরনের সুপারিশ স্থানীয় চিকিৎসকরা করতে চান না। কারণ কাকে সুপারিশ করবেন, সেটা একটা বিষয়। আবার যাকে সুপারিশ করা হলো, তার অধীনে যদি ভুল চিকিৎসায় রোগীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তবে তার দায় সুপারিশকারীর ঘাড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পরিবর্তে তাঁরা একটি স্টেটমেন্ট লিখে দেন, এই রোগীর এই সমস্যা আছে, যা দিয়ে আসলে বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়করণের শর্ত পূরণ হচ্ছে না। আবার সরকারি মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশ পাওয়াও কষ্টসাধ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে যদি সুচিকিৎসা থাকত, চিকিৎসাসেবার মান উন্নত হতো তাহলে মানুষ কিন্তু বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য যেত না। এতে বৈদেশিক মুদ্রারও বহির্গমন হতো না। অন্যদিকে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়করণে জটিল শর্তও কাম্য নয়। মেডিক্যাল বোর্ড বা স্থানীয় চিকিৎসকের সুপারিশ জটিল বিষয়। এগুলো সচরাচর ডাক্তাররা করতে চান না। তাই এগুলো উঠিয়ে দেওয়াই ভালো। এতে অবৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রার বহির্গমন রোধ করাও সম্ভব হবে।’

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

ভ্রমন সম্পর্কিত সকল নিউজ এবং সব ধরনের তথ্য সবার আগে পেতে, আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদেরকে ফলো করে রাখুন।

© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Customized By ThemesBazar.Com