১ এপ্রিল (মঙ্গলবার) অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর নীতিমালা সংক্রান্ত একটি বিল প্রস্তাব করার কথা জানিয়েছে সুইডিশ সরকার৷
এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফরসেল বলেছেন, ‘‘সুইডেনে আসা বেশিরভাগ মানুষই পুরোপুরি সৎ৷ তারা শুধু নিজেদের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য একটি উন্নত জীবন চান৷ তারা কাজ করেন, ভালো কিছু করেন, সুইডিশ ভাষা শিখে আমাদের দেশের অংশ হতে চান৷’’
তিনি আরো বলেন, ‘‘কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যেখানে অভিবাসন ইস্যুতে নাগরিকদের আস্থা কিছু মৌলিক নীতির উপর নির্ভর করে৷ অর্থাৎ, যারা সুইডেনে এসে অপরাধ করে, অথবা যাদের আচার-আচরণ ভালো নয়, তাদের এই দেশে থাকা উচিত নয়৷’’
২০১৫ সালে ইউরোপজুড়ে অভিবাসীপ্রবাহের সময় সুইডেনে বিপুল সংখ্যক মানুষ আশ্রয় চাইতে আসেন৷ এরপর থেকেই ধারবাহিকভাবে আশ্রয়নীতি কঠোর করে আসছে দেশটির বাম কিংবা ডানপন্থি সরকারগুলো
২০২২ সালে সুইডেনের ক্ষমতায় আসেন প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থি সরকার৷ পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে এই সরকার কিছুটা দুর্বল৷ তাদের সমর্থন দিয়েছে সুইডেনের অভিবাসনবিরোধী ডেমোক্র্যাটরা৷ ফলে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিবাসন ইস্যুতে প্রতিনিয়ত কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে উল্ফ ক্রিস্টারসনের সরকার৷
অভিবাসন ইস্যুতে নেয়া কঠোর নীতিগুলোর আইনি দিক এবং এর বৈধতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পেয়েছেন দেশটির সাবেক বিচারক রবার্ট শট৷ এ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তিনি৷ সুইডেনে বিদেশি বংশোদ্ভূত বা অভিবাসীদের থাকতে হলে ‘সৎ জীবপযাপন’ করতে হবে মর্মে একটি আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন সাবেক এই বিচারক৷
যা করা যাবে না
মূলত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, কাজের ভিসা নিয়ে আসা বিদেশি নাগরিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মাথায় রেখে এই প্রস্তাবটি দেয়া হয়েছে৷ যদি তারা ‘সৎ জীবনযাপন’ না করেন, তবে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাদের সুইডেনে বসবাসের অনুমতি প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করার ক্ষমতা পাবেন৷
অভিবাসনমন্ত্রী ফরসেল বলেন, সামাজিক সুরক্ষাখাতে কোনো অনিয়ম করা, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা কিংবা মাদকাসক্তির কারণে জনবিশৃঙ্খলা তৈরির মতো অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেয়া কিংবা সুইডেনের ‘নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নীতি কার্যকর করা হবে৷
তিনি বলেন, অভিবাসীদের মধ্যে যারা এখনও সুইডিশ নাগরিকত্ব পাননি, তাদের জন্য এই বিধান আরো কঠোর হবে৷
এ ধরনের প্রস্তাবে সরকারের সমর্থন দেয়ায় কড়া সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংস্থা সিভিল রাইটস ডিফেন্ডারস৷
গ্রুপের পরিচালক (আইন) জন স্টফার বলেন, ‘‘এটি (সমাজে) এমন একটি অবস্থা তৈরি করবে, যেখানে কিছু মানুষকে মত প্রকাশের জন্য শাস্তির আওতায় আনা হবে, আবার কিছু মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করবেন৷ এর ফলে, কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় সীমিত পরিসরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবেন৷’’
কঠোর হচ্ছে আশ্রয়প্রক্রিয়া
আশ্রয়প্রক্রিয়া কঠোর করতেও নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সুইডেন৷ এগুলোর মধ্যে আছে, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনা, পারিবারিক পুনর্মিলনের সুযোগ কঠোর করে সীমিত করা এবং ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের ভিসায় আসা অভিবাসীদের আয় সীমা বাড়ানো৷
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সুইডেনে আশ্রয় পাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম৷ শুধু তাই নয়, গত বছর সুইডেনে আশ্রয় চেয়ে করা আবেদনের সংখ্যাও ছিল ১০ হাজারের কম৷ আর সংখ্যাটি গত তিন দশকের হিসাবে সর্বনিম্ন৷
এছাড়া, সুইডিশ সরকার এমন একটি আইন করার কথা ভাবছে, যার মাধ্যমে একজন আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর তাকে অবশ্যই সুইডেন ছেড়ে যেতে হবে৷ যদি ছেড়ে না যান, তাহলে ওই আশ্রয়প্রার্থী পুনরায় আর দেশটিতে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করতে পারবেন না
সুইডেনে একজন আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন প্রত্যাখ্যান হলেও তিনি পালিয়ে বা আড়ালে থেকে চার বছর পর আবার আশ্রয় আবেদন করতে পারতেন৷ সেই সুযোগটি বন্ধ করতেই এই আইনটি প্রণয়নের কথা ভাবা হচ্ছে৷
এই আইনটি পাস হলে, প্রত্যাখ্যাত একজন আশ্রয়প্রার্থীকে প্রমাণ দিতে হবে যে তার প্রথম আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর তিনি সুইডেন ছেড়ে গেছেন৷
অভিবাসীদের সুইডেন ছেড়ে যেতে উৎসাহ যোগাতে ৩৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটির সরকার৷
এ বছরের শুরুতে সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য ‘রিটার্ন হাব’ তৈরির প্রতিও সমর্থন দিয়েছেন৷ এর অর্থ হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার অধিকার নেই এমন অভিবাসীদের, বিশেষত প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের ওই রিটার্ন হাবে পাঠানো এবং নিরাপদ দেশের তালিকা অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের সেখান থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে৷
ইনফো মাইগ্রেন্টস