মঙ্গলবার, ০১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বিমানবন্দর

  • আপডেট সময় শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর, কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—এগুলো শুধু আকাশপথের প্রবেশদ্বার ই নয় বরং বিশ্বমানের অভিজাত অভিজ্ঞতার প্রতীক।

বিশ্বের কিছু বিমানবন্দর শুধু পরিবহনকেন্দ্রই নয়, স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিকতার অনন্য নিদর্শনও বটে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিলাসবহুল সুবিধা ও মনোমুগ্ধকর নকশার কারণে এগুলো যাত্রীদের দেয় অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। কিছু বিমানবন্দর প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, যাত্রীরা সেখানে নামলেই মনে হবে যেন এক নতুন দুনিয়ায় প্রবেশ করেছে তারা। আবার কিছু বিমানবন্দরে রয়েছে চমৎকার উদ্যান, ঝরনা ও শিল্পকর্ম, যা ভ্রমণকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলে।

সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর, কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—এগুলো শুধু আকাশপথের প্রবেশদ্বার ই নয় বরং বিশ্বমানের অভিজাত অভিজ্ঞতার প্রতীক। আধুনিক স্থাপত্য ও নান্দনিকতার সংমিশ্রণে তৈরি এমন কিছু বিমানবন্দরের কথাই আজ তুলে ধরা হবে, যেগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বিমানবন্দরের তালিকায় রাখা হয়।

চাঙ্গি বিমানবন্দর, সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর শুধুমাত্র একটি যাতায়াতকেন্দ্রই নয়। এটি ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদানে যেন অপেক্ষায় বসে থাকে। টানা আটবার স্কাইট্র্যাক্সের ‘বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর’ খেতাব অর্জন করেছে এটি। অত্যাধুনিক নকশা, চমৎকার যাত্রীসেবা ও বৈচিত্র্যময় বিনোদন সুবিধা এটিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় বিমানবন্দরে পরিণত করেছে।

বিমানবন্দরটির অন্যতম আকর্ষণ ‘জুয়েল চাঙ্গি’, যেখানে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইনডোর জলপ্রপাত ও মনোরম উদ্যান। এছাড়া, এখানে রয়েছে সিনেমা হল, সুইমিং পুল, থিম পার্ক ও বিশ্বমানের কেনাকাটার সুযোগ, যা যাত্রাকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

দক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি, বিমানবন্দরটি ভ্রমণকে উপভোগ্য অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এটি শুধু যাত্রীদের জন্য নয়, ভ্রমণপিপাসুদের জন্যও এক অবিস্মরণীয় গন্তব্য।

বেইজিং দাসিং বিমানবন্দর, চীন

বেইজিং দাসিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০১৯ সালে উদ্বোধন করা হয় এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম একক টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত। বিশিষ্ট স্থপতি জাহা হাদিদ এর নকশায় নির্মিত এই বিমানবন্দরটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬৩ বিলিয়ন ডলার এবং এর কাজ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে চার বছর।

‘তারামাছ’ আকৃতির এই বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যশৈলী ও অত্যাধুনিক সুবিধাগুলো যাত্রীদের মুগ্ধ করে। প্রশস্ত ও উজ্জ্বল চেক-ইন হলে স্বয়ংক্রিয় ‘চেক-ইন কিয়স্ক’ এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে করে যাত্রীরা আরও সহজে ও দ্রুত বোর্ডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।

বেইজিং দাসিং বিমানবন্দর, চীন। ছবি: সংগৃহীত

বিমানবন্দরের ছাদে কাঁচের প্যানেল বসানো হয়েছে, যা প্রাকৃতিক আলো প্রবাহিত করে অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে আলোকিত ও মনোরম রাখে। এছাড়া, টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে সবুজ উদ্যান সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে যাত্রীরা বিশ্রাম নিতে পারেন।

পরিবহন সংযোগের ক্ষেত্রেও দাসিং বিমানবন্দর অত্যন্ত কার্যকর। এটি বেইজিং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এবং হাই-স্পিড ট্রেন, মেট্রো ও এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে শহরের সঙ্গে সংযুক্ত, যা যাত্রীদের যাতায়াতকে সহজ ও সুবিধাজনক করে তুলেছে।

সার্বিকভাবে, বেইজিং দাসিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আধুনিক স্থাপত্য, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ পরিবহন সংযোগের সমন্বয়ে গঠিত, যা যাত্রীদের জন্য একটি অনন্য ও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে।

জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অবস্থিত জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রতি ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বিমানবন্দর হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। এর আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলী ও অত্যাধুনিক নকশা এই সম্মান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা এই বিমানবন্দরটি ইংরেজি ‘এক্স’ অক্ষরের আকৃতিতে নির্মিত। প্রায় ৭ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই স্থাপনা একই সময়ে ১১ হাজার যাত্রী ও ৭৯টি উড়োজাহাজ ধারণ করতে সক্ষম।

জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সংযুক্ত আরব আমিরাত। ছবি: সংগৃহীত

বিমানবন্দরটির নকশায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় করা হয়েছে। চীনের দাসিং বিমানবন্দরের মতো এখানেও ছাদের মধ্যে কাঁচের প্যানেল ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক আলো ই অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উজ্জ্বল রাখে।

জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আধুনিক স্থাপত্য, উন্নত প্রযুক্তি ও সুবিধাজনক পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি অনন্য ভ্রমণকেন্দ্র। যাত্রীরা নিশ্চিতভাবেই আরামদায়ক ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা পেতে পারে এখান থেকে।

হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কাতার

কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই বিমানবন্দরটি গ্লোবাল আর্কিটেকচার ফার্ম এইচওকে (হেলমুথ, ওবাটা+, কাসাবাম) নকশা করেছে।

বিমানবন্দরটির নকশা আধুনিক ও সমসাময়িক হলেও এটি কাতারের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রেখেই নির্মিত হয়েছে। এর বাঁকা আকৃতির নকশা সমুদ্রের ঢেউ ও মরুভূমির বালির টিলা থেকে অনুপ্রাণিত।

বিমানবন্দরের স্বতন্ত্র এমিরি টার্মিনালটি (রাজকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ প্যাভিলিয়ন) পালতোলা নৌকার পালের আকৃতির, মসজিদটি পানির ফোঁটার আদলে তৈরি এবং অর্ধচন্দ্রাকৃতিতে নির্মিত হয়েছে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার।

প্রায় ৬ লাখ বর্গমিটারজুড়ে বিস্তৃত বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল কমপ্লেক্স ৭৫টি ফুটবল মাঠের সমান। এটি প্রতি ঘণ্টায় ৮ হাজার ৭০০ যাত্রী ও বছরে ৩০ মিলিয়নের বেশি যাত্রী সামলাতে সক্ষম। ভবিষ্যতে এর সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই সক্ষমতা ৫০ মিলিয়নে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি সমান্তরাল রানওয়ে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এয়ারবাস এ৩৮০-এর মতো বৃহৎ উড়োজাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কাতার। ছবি: রয়টার্স

কাতারি আতিথেয়তার প্রতিফলন হিসেবে বিমানবন্দরে রয়েছে দুটি হোটেল, ১২টি লাউঞ্জ, বিশাল ডিউটি-ফ্রি শপিং এলাকা ও একটি হেলথ ক্লাব, যেখানে স্কোয়াশ কোর্ট, জিম, স্পা ও সুইমিং পুলের সুবিধা রয়েছে।

এছাড়া, বিমানবন্দরের ভেতরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্পীদের বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রদর্শিত আছে। এর মধ্যে সুইস শিল্পী উরস ফিশারের ‘ল্যাম্প বেয়ার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব নান্দনিক উপাদান ও বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাত্রীদের জন্য এক ‘পাঁচ তারকা ভ্রমণ’ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে এবং কাতারে তাদের প্রথম অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তোলে।

বেঙ্গালুরু কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ভারত

বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোর স্থাপত্যে সাধারণত কাচ ও স্টিলের আধিক্য দেখা যায় এবং এগুলোতে সাদা রঙের ব্যবহার বেশি থাকে। তবে ভারতের বেঙ্গালুরু শহরের কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এই প্রচলিত ধারণা থেকে ব্যতিক্রম।

‘গার্ডেন সিটি’ নামে পরিচিত বেঙ্গালুরুতে ২০২৩ সালে টার্মিনাল-২ চালু হয়, যা নকশা ও পরিবেশগত দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য বা চীনের বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যেন যাত্রীরা একটি বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন বলে মনে করেন। টার্মিনালে ঝুলন্ত টবে সবুজ গাছপালা, বাঁশের আবরণে ঢাকা ছাদ ও উন্মুক্ত প্রকৃতি যাত্রীদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

বেঙ্গালুরু কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ভারত। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের শুরুর দিকে নকশাগুলো চীনের আদলে করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে চালু হওয়া বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ বিমানবন্দর ছিল কাচ ও স্টিলের প্রচলিত কাঠামোর ভিত্তিতে নির্মিত। এগুলো ডিজাইন করেছিল মার্কিন স্থাপত্য সংস্থা এসওএম। তবে বেঙ্গালুরুর দ্বিতীয় টার্মিনালের ক্ষেত্রে এক ভিন্ন নকশা প্রণয়ন করা হয়।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

ভ্রমন সম্পর্কিত সকল নিউজ এবং সব ধরনের তথ্য সবার আগে পেতে, আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদেরকে ফলো করে রাখুন।

© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Customized By ThemesBazar.Com