শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

হারিয়ে যাওয়াসহ যে সমস্যায় পড়েন হাজিরা, সঙ্গে যা রাখবেন

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৬ মে, ২০২৩

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। সেখানে গিয়ে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, নতুন পরিবেশসহ নানা কারণে তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেকে হারিয়েও যান। পড়তে হয় নানা হেনস্তার মুখোমুখি।

হজ পালন করতে গিয়ে হাজিরা যে ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি সমস্যা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, অনেক সময় হাজিরা প্রতারিতও হন। হারিয়ে গেলে কী করতে হবে বুঝতে পারেন না। অবশ্য হাজিদের সমস্যা সমাধানে তৎপর বাংলাদেশ মিশন।

হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ

বিবিসি জানায়, গত বছর ওমরাহ পালন করতে গিয়ে ১২৩ জন বাংলাদেশি মারা যান এবং অসংখ্য ওমরাহযাত্রী সৌদি আরবে হারিয়ে যান বলে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ অফিসের কাউন্সিলর।

গত ২৩ জানুয়ারি লেখা ওই চিঠিতে হজযাত্রীদের হারিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং এসব বিষয়ে সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা চাওয়া হয়।

তবে হজ বা ওমরাহ পালন করতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া সমস্যা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অধিশাখার উপসচিব ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হক।

তিনি বলেন, “হজে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা খুব কম। কারণ হজে যাওয়ার সময় সবার গলায় বাধ্যতামূলকভাবেই প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর ও ঠিকানা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত ওমরাহ করতে গিয়েই হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে।”

তিনি জানান, হারিয়ে যাওয়া নিয়ে মানুষ এখন আগের চাইতে অনেক সচেতন হয়েছে। কেননা এ নিয়ে হাজিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতি ৪৪ জন হাজির জন্য একজন গাইড থাকেন। তাদের নির্দেশনা দেওয়া থাকে যেন কোনো হাজি একা কোথাও না যান। এই গাইডরা হাজিদের সমস্যার সমাধানে কাজ করেন।

হারিয়ে গেলে যেখানে যোগাযোগ করবেন

ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হক বলেন, “কেউ হারিয়ে গেলে তাকে যদি মক্কার ইব্রাহিম খলিল রোডে বাংলাদেশ হজ অফিস কিংবা মদিনার কিং ফাহাদ ২১ নম্বর গেইটের কাছে বাংলাদেশের হজ অফিসে আনা হয় তাহলে সেখানকার আইটি বিভাগ তার পরিচয় বের করে ঠিকানা মতো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।”

হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সব সময় দলের সাথে যুক্ত থাকা এবং গলায় ঝোলানো ব্যাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফোন নম্বর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বয়স্ক কাউকে নিয়ে হজে গেলে ভিড়ের মধ্যে তারা যেন দলছুট হয়ে না যান সেদিকে সজাগ থাকতে বলেছেন।

কয়েকজন হজযাত্রী, ওমরাহ পালনকারী এবং ভুক্তভোগীরা বলছেন, কেউ হারিয়ে গেলে কোথায় অপেক্ষা করতে হবে এমন একটি জায়গা আগে থেকেই ঠিক করে রাখলে দুশ্চিন্তা এড়ানো যায়।

এজেন্সির প্রতারণা

সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে হজ পালন করতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করেন হাজিরা। এ নিয়ে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বড় অভিযোগের জায়গা হল বিভিন্ন হজ এজেন্সি তাদের এক ধরনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যান। পরে গিয়ে দেখেন উল্টো চিত্র।

হজ করতে গিয়ে এমন বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন আবুল কালাম। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হাজিরা চান তাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মক্কায় থাকার সময় কাবা শরিফে পড়তে আর মদিনায় থাকলে মসজিদে নববিতে পড়তে। এ জন্য তারা চান হোটেল যেন হাঁটার দূরত্বে হয়। এ জন্য এজেন্সিগুলো বেশি টাকা চার্জ করে। কিন্তু গিয়ে দেখা যায় যে ক্যাম্প থেকে মসজিদ এতোই দূরে যে হেঁটে যাওয়ার উপায় নাই। তার মধ্যে নোংরা পরিবেশ, পানি না থাকা, নোংরা টয়লেটের সমস্যা তো থাকেই। এজেন্সিগুলো এই হজ নিয়েও ব্যবসা করে।”

এ বিষয়ে সরকারের সুনজর থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এক্ষেত্রে কোন এজেন্সির মাধ্যমে হজে গেলে সেটি বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রাপ্ত বৈধ এজেন্সি কিনা এবং ওই এজেন্সির বিরুদ্ধে সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ রয়েছে কিনা, তা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে হজ মিশন।

ওই এজেন্সির মাধ্যমে আগে যারা হজ বা ওমরাহ করেছেন, তাদের কাছ থেকে সার্ভিস সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই দালাল বা বেনামী মোয়াল্লেমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এজেন্সিগুলো বিভিন্ন দামে নানা ধরনের হজ প্যাকেজ সুবিধা দিয়ে থাকে এক্ষেত্রে প্যাকেজের টাকা দেখে নয় বরং সার্ভিস দেখে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এজেন্সির মাধ্যমে হজ আদায় করা ব্যক্তিরা।

তারা বলছেন, “হজ প্যাকেজে থাকা, খাওয়া, বিমান ভাড়া সব সুবিধাদি আছে কিনা তা যাচাই করে প্যাকেজ নির্বাচন করতে হবে। কম টাকার প্যাকেজে অনেক জরুরি সার্ভিস বাদ পড়তে পারে আবার প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

এছাড়া হজ গাইড বা মোয়াল্লেম এজেন্সির পক্ষ থেকে কী ধরনের সেবা দেবেন এবং অতিরিক্ত সেবা বাবদ কতো খরচ নেবেন সেটি লিখিত রাখলে পরবর্তী বিড়ম্বনা এড়ানো যায়।

থাকা-খাওয়া

মক্কা বা মদিনায় যেখানে থাকবেন সেই হোটেল, ক্যাম্প বা বাসা কি ধরনের, মসজিদ থেকে কত দূরে, লিফট আছে কিনা, একেক কক্ষে কতজন থাকবেন, একটি টয়লেট কতজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে যেতে হবে। এমন পরামর্শ দিয়েছেন হজ পালনকারীরা।

সৌদি আরবে পৌঁছে তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে কিনা, খাবার না দিলে কোথায় কি ধরনের খাবার পাওয়া যাবে, কত খরচ পড়বে সে বিষয়ে ধারণা রাখার পরামর্শ তারা দেন।

হজ ক্যাম্পে বাংলাদেশি হাজিদের খাবার হিসেবে সাধারণত ভাত দেওয়া হয়। এতো ভাত খাওয়ার কারণে অনেক যাত্রীর ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে তাদের বিকল্প খাবার যেমন রুটি, সবজি, শুকনো খাবার পরামর্শ দেয় হজ মিশন।

এ ব্যাপারে হজ অধিশাখার উপসচিব ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হক বলেন, “এজেন্সির বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল, তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এজেন্সির সার্বিক সেবা নজরদারির জন্য মক্কা ও মদিনায় বাংলাদেশের মিশনের কয়েকটি দল কাজ করে থাকে।”

এজেন্সি হাজিদের যেখানে রাখবে সেটার তালিকা মিশনকে দেয়। পরে মিশন থেকে একটি দল সরেজমিনে গিয়ে থাকা খাওয়ার পরিস্থিতি পরিদর্শন করে। এরপর হাজি ও মোয়াল্লেমের সঙ্গে কথা বলে মক্কার কাউন্সিল অফিসের কাছে রিপোর্ট জমা দেয়।

সেবা ঠিকঠাক মতো না থাকলে বা কোনো অভিযোগ থাকলে মিশনের পক্ষ থেকে না-হলে সৌদি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সেটা তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়।

অসুস্থতা

এদিকে হজ ও ওমরাহ সফরে বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ পথ হাঁটা তার ওপর প্রচুর মানুষের ভিড় থাকায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ জন্য মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি বলে মনে করেন হজ পালনকারীরা।

এরপরও কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের জন্য মক্কা ও মদিনায় মিশন অফিসে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা আছে বলে জানান ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অধিশাখার উপসচিব ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল হক।

এর বাইরে মক্কা-মদিনায় মিনা, মুজদালিফা, আরাফাতে ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাজিদের জন্য সব স্বাস্থ্যসেবা এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সেবাও বিনামূল্যে দেওয়া হয়ে থাকে।

তবে কোন হজযাত্রীর যদি নিয়মিত কোন ওষুধ খেতে হয় তাহলে যতোদিন সফরে থাকবেন সেই হিসেব করে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সাথে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারি হজ নির্দেশিকায়। কেননা সৌদি আরবে চাইলেই কেউ ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে পারেন না। এ জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেখাতে হয়।

অন্যান্য সমস্যা

যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে হজের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা, কোথায় কী করতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন হজ পালনকারীরা।

এ নিয়ে সরকারি নির্দেশিকা সাথে রাখা যেতে পারে। এছাড়া আগে হজ পালন করেছেন, এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে গেলেও অনেক সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

যা যা রাখবেন সাথে

যারা হজ বা ওমরাহ পালন করবেন, তাদের প্রত্যেকের সাথে স্থায়ী ঠিকানা, জরুরি যোগাযোগের মোবাইল নম্বর, মক্কা-মদিনায় আবাসিক হোটেলের ঠিকানা, পাসপোর্টের ফটোকপি, ছবিসহ আইডি কার্ড সার্বক্ষণিক সঙ্গে রাখা জরুরি।

পাসপোর্ট সাবধানতার সাথে সংরক্ষণ করা। কোনো কারণে পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ হজ অফিসে যোগাযোগ করা এক্ষেত্রে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল থেকে ট্রাভেল পারমিট গ্রহণ করা যেতে পারে।

এছাড়া হজ বা ওমরাহযাত্রী মারা গেলে মরদেহ সৌদি আরবে দাফন কিংবা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উপায়ও চিঠিতে জানিয়েছেন হজ কাউন্সিলর।

সৌদি আরবে আসার সময় ব্যাগ গোছানোর সময় ইহরাম, প্রয়োজনীয় কাপড়, গামছাসহ কয়েকটি জিনিষ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে হজ নির্দেশিকায়। সেগুলো হলো- সাবান, পেস্ট, ব্রাশ, মিসওয়াক, নেইলকাটার, সুই সুতা, কাগজ কলম, চিরুনি, খাবার বাসন, গ্লাস ইত্যাদি কেননা এগুলো হোটেল থেকে সরবরাহ নাও করা হতে পারে। এক সেট শীতের কাপড় রাখতে হবে, কেননা মদিনায় রাতে ঠাণ্ডা পড়ে।

চশমা পড়লে অতিরিক্ত এক সেট চশমা রাখা নিরাপদ, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, সাথে সৌদি রিয়েল ও বাংলাদেশি টাকা রাখতে পারেন।

ব্যাগ বা স্যুটকেস তালাবদ্ধ রাখা ভালো। ব্যাগের ওপরে নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর লিখে রাখতে হবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

ভ্রমন সম্পর্কিত সকল নিউজ এবং সব ধরনের তথ্য সবার আগে পেতে, আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদেরকে ফলো করে রাখুন।

© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Customized By ThemesBazar.Com