1. b_f_haque70@yahoo.com : admin2021 :
  2. editor@cholojaai.net : cholo jaai : cholo jaai
সোনার কেল্লার সন্ধানে
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৮ পূর্বাহ্ন

সোনার কেল্লার সন্ধানে

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনার কেল্লার সন্ধানে মন উড়ুউড়ু। বর্ণময় রাজস্থানের উত্তর পশ্চিম প্রান্ত শহর থর মরুভূমির রহস্যে ও বৈচিত্র্যে ভরা। সোনার কেল্লার মহিমায় উদ্ভাসিত এই শহরে যেতে গেলে কোন প্রাণে জোধপুর আর বিকানেরকে বাদ দিই? তাই যাত্রা শুরু মরু শহর বিকানেরের উদ্দেশে। রাজস্থানে ট্রেন ঢোকার পর থেকে দুপাশে তাকিয়ে থাকি ময়ূরের দেখা পাব বলে। কিন্তু ময়ূরের দেখা মেলেনি।

পরিচ্ছন্ন শহর বিকানের। অল্প ঠান্ডা। হোটেলের দেয়ালে রাজস্থানি পেন্টিং। পরের দিন রুফ টপ রেস্তরাঁয় ব্রেকফাস্ট খেতে গিয়ে হিমেল হাওয়ার অতর্কিত আক্রমণ। ঝকঝকে সকালে বিকানের ভ্রমণ শুরু।

প্রথমেই জুনাগড় ফোর্ট। জোধপুরের ঔজ্জ্বল্য আর জয়সলমীরের রহস্যের পাশে বিকানের যেন একটু অবহেলিত। কিন্তু আমাদের মন কেড়ে নিল জুনাগড় ফোর্টের শ্বেত পাথরের নির্মাণশৈলী আর উস্তা শিল্পের নমুনা। প্রথমে এই দূর্গের নাম ছিল ‘চিন্তামণি’। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে যখন রাজপরিবার লালগড় প্যালেসে চলে যান তখন নাম হয় জুনাগড়। পনেরশো তিরানব্বই সালে এই দূর্গের নির্মাণ হয় মুঘল, রাজপুত ও গুজরাতি স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে। স্যান্ডস্টোনে তৈরি লালগড় প্যালেস অতীতের ঔজ্জ্বল্যের স্মারক। এখানেই রয়েছে সাদুল সিং মিউজিয়াম। সেখানে রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজকীয় পোশাক,অস্ত্রশস্ত্র,বাসনপত্র আরও অনেক শিল্পগুণসম্পন্ন বস্তুর সম্ভার। রাজপরিবারের ব্যবহৃত নিজস্ব রেলগাড়ি চমকে দেয়। বেরিয়ে দেখি একদল লোকশিল্পী গান গেয়ে চলেছে। সোনার পাতার কারুকাজ, জৈন মন্দিরের শ্বেতপাথর আর লাল স্যান্ডস্টোনের গলাগলি, রঙ বেরঙা বন্ধেজের পাহাড়, বিখ্যাত পাঁপড় ও ভুজিয়া সব নিয়ে বিকানেরের উজ্জ্বল উপস্থিতি।

জোধপুরে আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পাঁচশ বছরের পুরনো হাভেলীতে গড়ে ওঠা হোম স্টের অনাবিল আতিথেয়তা। নরম রোদে, ঠাণ্ডা হাওয়াকে সঙ্গী করে বিশাল চওড়া রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটলাম মেহরন্ গড় দু্র্গের দিকে।

শহর থেকে চারশ দশ ফিট উচ্চতায় পরিপূর্ণ মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে মেহরন্ গড় দুর্গ। লিফ্টে চেপে দুর্গের সর্ব্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে দেখলাম চারিদিকে নীল রঙের সমাহার। তাই জোধপুর ব্লু সিটি। গাইড বলল শুধু ব্রাহ্মণদের বাড়িগুলো নীল রঙের হত। দুর্গের চারপাশে বোধহয় ব্রাহ্মণরাই থাকতেন। চোদ্দশ ষাট সন নাগাদ রাও যোধার হাতে এই দুর্গের সৃষ্টি। দুর্গের ভেতরে বিস্তৃত প্রাঙ্গণে অনুপম কারুকার্য্যে মোড়া প্রাসাদ। মিউজিয়ামে দেখা বিভিন্ন নকশার পাল্কির মধ্যে সোনালী গিল্টি করা “মহাদোল” নামে পাল্কিটি অসামান্য।

এরপর উমেদ ভবন, বর্তমান রাজপরিবারের বাসস্থান। একটি অংশ হোটেলে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্যতম স্থপতির নাম বিদ্যাধর ভট্ট্যাচার্য্য জেনে গর্ব অনুভব করলাম। এই প্রাসাদ নির্মাণকালে দুর্ভিক্ষপীড়িত জনগণের জীবিকা অর্জনের সুযোগ হয়েছিল। দেখা হল যশবন্ত থাডা, সমাধিস্থল, ম্যান্দোর গার্ডেন আরও কত কি। চড়া রোদ আর রুক্ষ হাওয়া ক্লান্ত করে দিয়েছিল। চাঙ্গা করে দিল বাজারে কিসমিস, পেস্তার সস্তা দাম।

অবশেষে পেলাম হোম স্টের মালিকের নিজের হাতে বানানো বিশালাকায় আলু পরোটায় আন্তরিকতার স্বাদ। কপালে জুটে গেল রাজস্থানী রীতিতে সজ্জিত ঘরে ঝরোখার গদিতে গা এলিয়ে বিশ্রাম।

পরের দিন কেল্লার পেছন দিকে রানীদের স্নানের দীঘির পাশে ঘুরে বেড়িয়ে, শহরে একবার চক্কর দিয়ে জয়সলমীরের উদ্দেশে রওনা হলাম। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে জয়সলমীর স্টেশনে নামা হল। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ছুরির মত এসে বিঁধল মুখে। হোটেলে যেতে যেতে দেখলাম অনেক দোকানের নাম বাংলা হরফে লেখা। হোটেলে ঢুকে বেড়াবার ব্যবস্থাপত্র করে নিয়ে বেরোলাম চারপাশটা ঘুরে দেখতে। ছিমছাম বাজার। যথারীতি বাঁধনি, আর কাঁচ বসানো পোশাকের ছড়াছড়ি। পাথরের বাসন আর মূর্তি হাতছানি দিচ্ছে ট্যুরিস্টদের। রাজস্থানী পাগড়ি পরে অনায়াসে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিদেশী ট্যুরিস্টরা। বাঙালী ট্যুরিস্টদের প্রাবল্যে বেশ একটা বাঙালীয়ানার সৃষ্টি হয়েছে। দোকানীরা মাঝে মাঝেই বাংলায় ডাকাডাকি করছে। সত্যজিত রায় নামটা মুখে মুখে ঘুরছে। সোনার কেল্লা ছবির মুকুল যেন ঘরের ছেলে। আর সোনার কেল্লা? সেতো জয়সলমীরের বড় আদরের ধন!

পরের দিন পাড়ি দেয়া হল স্যাম্ ডিউনসের দিকে। স্যাম ডিউনস্ শহর থেকে বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দুরে। সাহারা মরুভূমির সঙ্গে এর নাকি মিল আছে। পড়ন্ত দুপুরে এক রাশ রুক্ষ হাওয়ার মুখোমুখি হয়ে সারথী আকবর ভাইয়ের মজাদার গল্প শুনতে শুনতে এগিয়ে চললাম মরুভূমির ছোঁয়া পাবার জন্য। শহর পার হয়ে শুরু হল রাস্তার দু’পাশে অঢেল বালিয়াড়ি, ঝকঝকে রোদ। চওড়া হাইওয়ে দিয়ে হু হু করে ছুটছে পর্য্যটকদের গাড়ি মরুভূমিতে সূর্যাস্তের সাক্ষী হতে। সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। দু’চারটি কাঁটাগাছ মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অসীম প্রতীক্ষায়।

যেদিকে দু’চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। বালির রাজ্যে ঢুকলাম একটি গ্রামে। সূয্যিমামার নিদ্রা যেতে বেশ খানিকটা দেরি আছে। আসর সাজিয়ে বসে আছে লাগাম ছাড়া রোদ। সঙ্গ দিচ্ছে গরম হাওয়ার হলকা। একটি কূ্য়ো অসহায়,অক্ষম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাণ্ডার প্রায় শূ্ন্য। বালির মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট বাড়িগুলো। কয়েকটা কুকুর ধুঁকছে তেষ্টায়। একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামতেই ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটে বেরিয়ে এল। মুখে উজ্জ্বল হাসি, রুক্ষ চুলে বালির ছিটে। মহিলারা এগিয়ে এলেন রঙ বাহারি, সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ হাতের কাজের নমুনা নিয়ে। এই অতুলনীয় শিল্পসৃষ্টিগুলোই শহরের দোকানে কাঁচের শোকেস আলো করে থাকে। হাতবদল হয় চড়া দামে। এঁদের রৌদ্রতপ্ত মুখে অম্লান হাসি আর কাঁচ বসানো ঘাঘরায় হাজার সূর্যের ঝলক। আবার এঁরাই বালি ভেঙে বহু দূর পাড়ি দেন পানীয় জল সংগ্রহের জন্য। কঠোর জীবনসংগ্রাম ওঁদের মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারেনি।

অতন্দ্র প্রহরীর মত সারি সারি উটের দল বসে মরুভূমি পাহারা দিচ্ছে। পাশের ছোট চা’য়ের দোকানে খাটিয়ায় বসে গলা ভেজাতে ভেজাতে জটায়ুর ফেলুদার সঙ্গে উট নিয়ে বিচিত্র কথোপকথন মনে পড়ে গেল। তারপর উটের পিঠে বা উটের গাড়িতে চেপে অন্তহীন বালির রাজ্যে পা রাখলাম সবাই। মাথার ওপর সূর্যদেব স্বমহিমায় প্রকাশিত। বালি ভেঙে উঠছি আর নামছি। ভারত পাকিস্তান সীমান্ত নাগালের মধ্যে। উটওয়ালাদের কল্যাণে জানা গেল এখানে বিভিন্ন সিনেমার শুটিঙের কথা। মনে হচ্ছে ব্যস্ত শহুরে জীবন থেকে অনেক দূ্রে চলে এসেছি। সূর্যাস্তের প্রতীক্ষা করছি সবাই। উটরা একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছে। রোদে বালি  ঝলমল করছে। ট্যুরিস্টদের ক্যামেরা প্রস্তুত।

অবশেষে সূয্যিমামার পাটে বসার সময় হল। বিশাল সোনার থালাটি চারিদিক কালোয় মুড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে বিদায় নিল। ছায়াঘন অন্ধকারে সব রুক্ষতা মুছে দিয়ে প্রকৃতি যেন এক শীতল ওড়নায় ঢেকে দিল সবাইকে। এই আলো আঁধারের খেলায় রোমাঞ্চিত হলাম। জীবনেওতো এই আলো আঁধারের খেলা নিত্যই চলছে!
এরপর ‘ডেসার্ট ক্যাম্পে’ এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা উপহার পেলাম। কপালে তিলক পরিয়ে রাজস্থানী রীতিতে বরণ করে বসানো হল উন্মুক্ত আকাশের তলায়। ঠাণ্ডা ক্রমশ বাড়ছে। মাঝখানে জ্বলছে আগুন। লোকশিল্পীর গলায় বেজে উঠল “কেশরিয়া বালমা”র উদ্দেশে এক অনবদ্য চিরন্তন আকূ্তি। নিঝুম অন্ধকারে, বালির দেশে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ল দূ্র থেকে দূ্রান্তরে।

তারপর শুরু হল প্রসিদ্ধ ‘কালবেলিয়া’ নৃ্ত্যের আসর। লাল, কালোয় মেশানো, কাঁচ বসানো ঝলমলে পোশাকে সাপের ভঙ্গীতে নাচ ওই আলো আঁধারি সন্ধ্যায় এক অতিন্দ্রিয় পরিবেশের সৃষ্টি করল। এই বিচিত্র অনুষ্ঠান মুগ্ধ করল। সবশেষে নির্ভেজাল, রাজস্থানী ডিনারের পর গভীর রাতে অন্ধকারের বুক চিরে ক্লান্ত দেহে পরিতৃপ্ত মনে হোটেলে ফেরা।

পরের দিন কল্পনার রঙে রঙীন “সোনার কেল্লা” সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিল। বাঙালীর মনে তো মুকুলের সোনার কেল্লা একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এগারোশ ছাপ্পান্ন এ.ডি তে রাওয়াল জয়সল ত্রিকূট পাহাড়ের ওপর এই দূর্গটি নির্মাণ করেন। সোনালী হলুদ রঙের এই দূর্গ মরুভূমির বালির রঙে মিশে যায়। তাই বোধহয় এর নাম সোনার কেল্লা। দু’হাজার তেরো সালে এটি ওয়র্লড্ হেরিটেজ সাইট বলে ঘোষিত হয়। চারটি প্রবেশপথ সম্বলিত, বিশাল প্রাচীর বেষ্টিত এই দূর্গ যেন একটি ছোটখাটো শহর। পাঁচ হাজারের ও বেশি লোকের বসতি এখানে। সরু রাস্তা, বাড়ি, মন্দির, হ্যান্ডিক্র্যাফটের দোকান একেবারে জমজমাট পরিবেশ। প্রস্তরখচিত দূর্গের মডেল যেন ভারতের মানচিত্র। রাজমহলের প্রবেশপথে সতীদের হাতের ছাপ, রূপোর করোনেশন থ্রোন, দূর্গের সর্বোচ্চ তল থেকে অসাধারণ ভিউ দেখে শেষ করা যায় না। দূর্গের ছাদে উদ্দাম হাওয়া উপভোগ করতে করতে বুঝতে পারছিলাম কেন বিদেশী পর্যটকরা এক অমোঘ আকর্ষণে বারবার এখানে ছুটে আসে।

কুয়েকটা দিন স্বপ্নের মত কেটে গেল। উনিশ শতকের স্থাপত্য শিল্পের নমুনা পাটোয়াঁ কি হাভেলী, বড়া বাগ, গাদিস্সর লেক আর ও অনেক কিছুই মন ভরাল। মুকুল আর সত্যজিত রায়ের প্রতি জয়সলমীরের অধিবাসীদের মমতা ও শ্রদ্ধা গর্বিত করল।

জয়সলমীর আছে নিজের মহিমায়। হাভেলীর চত্বরে পুতুলগুলো নেচে নেচে গান শোনায়। সোনালী পাথরের লোভনীয় বাসন ডাকে। বিক্রেতারা অকপটে জানায় কৃতজ্ঞতা সত্যজিত রায়ের প্রতি। মধ্যযুগীয় ব্যবসাকেন্দ্র জয়সলমীরকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে এই শহর পর্যটকদের দাক্ষিণ্যে।

স্মৃতির ভান্ডারে জমল অনেক পুঁজি। বিকানেরে আলি ভাইয়ের আন্তরিকতা, জোধপুরে ওম পুরোহিতজির আত্মীয়সুলভ আতিথেয়তা, সোনার কেল্লার গাইড নকুলের দুঃখের কাহিনী।

আমাদের ট্রেন ছাড়বে গভীর রাতে। নির্জন স্টেশন থেকে দূ্রে দেখা যাচ্ছে সোনার কেল্লার আলো। অন্ধকার আকাশের কপালে সোনালী টিপের মত জ্বলজ্বল করছে। হাতছানি দিচ্ছে ভ্রমণপাগল পর্যটকদের।

কি ভাবে যাবেন :-

জোধপুর এক্সপ্রেস বা জয়সলমীর এক্সপ্রেসে যাওয়া যেতে পারে। বিমানপথ তো আছেই।

কোথায় থাকবেন :-

বিভিন্ন বাজেটের হোটেল আছে। জোধপুরে যশবন্ত ভবন হোম স্টে ফোন নং – 09783772838

বিকানেরে স্টেশনের কাছেই আছে যমনাবিলাস গেস্ট হাউস।

জয়সলমীরে আছে হোটেল আকাশদীপ।

কেনাকাটা :-

বিকানেরে কুন্দন জুয়েলারি, জোধপুরে বাঁধনি, কাঁচের ও গালার চুড়ি, রজাই, পেন্টিং।

জয়সলমীরের পাথরের বাসন, বিখ্যাত কাঠপুতলি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com