শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

রূপকথার মায়াপুরীতে বদলে দেয় ভিভিড সিডনি

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০২৪

প্রতিবছর সিডনিকে রূপকথার মায়াপুরীতে বদলে দেয় ভিভিড সিডনি। একই সঙ্গে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে আলোময় হয়ে ওঠে গোটা সিডনি। রাতের সিডনি জীবন্ত আর মোহময় হয়ে ওঠে।

বছরের এই সময়টা শীতের প্রকোপে সিডনি শহর ঝিমিয়ে পড়ে। ঝিমিয়ে পড়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো; বিশেষ করে খাবারের দোকানগুলো। ফলে পুরো অর্থনীতিই একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তখন তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই আলোর উৎসব একদিকে যেমন মানুষকে বিনোদন দেয়, অন্যদিকে অর্থনীতিকেও চাঙা করে।

এবারের ভিভিড সিডনির থিম হচ্ছে মানবতা। আর এই আলোর উৎসব ২৪ মে শুরু হয়ে চলবে ১৫ জুন পর্যন্ত। আরেকটু বিস্তারিত বললে আমাদের একে অপরকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন। আমরা কে এবং আমরা কী করতে সক্ষম, তা খুঁজে বের করার জন্য আমাদের কেবল নিজের ভেতরে তাকাতে হবে। সেই জিনিসগুলো খুঁজে পেতে ভেতরে তাকাতে হবে, যা আমাদের প্রকৃত মানুষ করে তোলে যেমন প্রেম, দয়া, মমতা, সৃজনশীলতা ও মানবতা।

ভিভিডের আলোয় অপেরা হাউসের দেয়াল জীবন্ত হয়ে ওঠে
ভিভিডের আলোয় অপেরা হাউসের দেয়াল জীবন্ত হয়ে ওঠে

ভিভিড সিডনি ডেস্টিনেশন এনএসডব্লিউ এবং নিউ সাউথ ওয়েলস সরকারের পর্যটন সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। ভিভিড সিডনি আইএফইএ পিনাকল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৩–এ ১৭টি পুরস্কার জিতেছে। এ ছাড়াও ভিভিড সিডনি ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার সেরা পর্যটন ইভেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়।

সিডনির যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনি এই আলোর নান্দনিকতা দেখা শুরু করতে পারেন। তবে পুরো আয়োজন দেখতে হলে আপনাকে বেশ কয়েক দিন যেতে হবে। এক দিনে সব দেখে শেষ করা যাবে না। আর মানসিক ও শারীরিকভাবে হাঁটার প্রস্তুতি থাকতে হবে। ট্রেনে করে আপনি সেন্ট্রাল বা সার্কুলার কিয়ে স্টেশনে নামতে পারেন। তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে, আপনি সেন্ট্রাল স্টেশনে নামেন। তারপর সেন্ট্রালের যে টানেলটা ইউটিএসের দিকে গেছে, সেটা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তাহলে আপনি জনস্রোতে পড়বেন। এরপর আপনি হেঁটে হেঁটে পাওয়ার হাউস মিউজিয়াম হয়ে ডার্লিং কোয়ার্টারে এসে পড়বেন। সেখান থেকে ডার্লিং হারবার হয়ে বারাঙ্গারু ফেরি পর্যন্ত আসবেন। তারপর ফেরিতে করে সার্কুলার কিয়েতে যাবেন।

ভিভিড সিডনি ২০২৪–এর থিম হলো মানবতা
ভিভিড সিডনি ২০২৪–এর থিম হলো মানবতা

এভাবে গেলে আপনি পুরো ভিভিড সিডনির একটা ধারণা পাবেন। এরপর বাকিটা আপনাকে হেঁটে হেঁটে দেখতে হবে। পথে পথে এবার রাখা হয়েছে দর্শনার্থীদের উষ্ণ করে তোলার জন্য আগুনের ব্যবস্থা। আর আছে অনেক রকম ও স্বাদের খাবারের দোকান। এবার খাবারের দোকানের আধিক্য সবচেয়ে বেশি দেখলাম। আর পথে পথে দেখতে পারেন স্ট্রিট ম্যাজিক শো বা শুনতে পারেন স্ট্রিট মিউজিক। এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমি প্রথম ভিভিড শোতে যাই ২০১৬ সালে। তখন সব জায়গার সব আলোকসজ্জা বিনা মূল্যে দেখা যেত। কিন্তু এখন প্রায় সবগুলোই টিকিট কেটে দেখতে হবে; বিশেষ করে যেগুলো একটু বেশি জমকালো। যা হোক, ভিভিড শো বড়দের চেয়ে শিশুরা বেশি উপভোগ করে। আমার এখনো মনে আছে, যেবার প্রথম আমার সন্তানেরা গিয়েছিল, সেবার অপেরা হাউসের গায়ে হাত দিয়ে যাচাই করে দেখছিল যে তার গায়ের রংটা আসল নাকি নকল।

সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে বের হলেই সামনে পড়বে একটা বিশালাকার জ্বলন্ত হৃদয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি সপরিবার ছবি তুলে নিতে পারেন। পাশাপাশি শীতের রাতে কিছুটা ওমও পাবেন। এরপর হাঁটতে শুরু করলেই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খাবারের দোকান। কিছু দোকান আছে, আপনি অর্ডার করলে সঙ্গে সঙ্গেই খাবার দিয়ে দেবে। আর কিছু দোকান আছে, যেখানে আপনি চাইলে নিজে নিজে খাবারের বিভিন্ন পদ তৈরি করে নিতে পারবেন। এ ছাড়াও রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট ড্রামে আগুন রাখা হয়েছে দর্শনার্থীদের একটু উষ্ণতা দেওয়ার জন্য।

ডারলিং কোয়ার্টারের আলোকসজ্জা
ডারলিং কোয়ার্টারের আলোকসজ্জা

এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আপনি পাওয়ার হাউস মিউজিয়াম পর্যন্ত গেলে রাস্তাটা ঘুরে ডার্লিং কোয়ার্টারের দিকে গেছে। সেখানে রাস্তার পাশে এআইয়ের বেশ কিছু বেলুন আকৃতির পর্দা বসানো। আপনি পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে সামনে রাখা লাল বোতামে চাপ দিলে এআই আপনার শারীরিক অভিব্যক্তি দেখে কবিতা রচনা করে দেবে। সেটা দেখেই আমরা তিনজন হাসি হাসি মুখে পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে একটা সুন্দর কবিতা রচনা করে দিল। এরপর কিছু দূর এগোতেই ডার্লিং কোয়ার্টারের আলোকসজ্জা চোখে পড়ল। সেখানে একটা জায়গায় জ্বলন্ত ভিভিড লেখা চোখে পড়ল। এ ছাড়াও একটা গোলাকার মঞ্চের ওপর গোলাকার আলোর বৃত্ত ক্ষণে ক্ষণে রং বদলাচ্ছিল। পাশাপাশি বেজে চলছিল বিভিন্ন রকম সংগীত।

একটা জায়গায় একটা গাছের মতো আকৃতির মধ্যে মনে হচ্ছিল অনেকগুলো ছাতা বন্ধ হচ্ছে ও খুলছে। সেটা আবার একসময় মানুষের মুখের আদল নিচ্ছিল।

এরপর কিছু দূর এগোতেই ডারলিং হারবারের পানিতে আলোর নাচন চোখে পড়ল। প্রথমে ফোয়ারার মতো করে পানিকে শূন্যে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর তার ওপর বিভিন্ন কোণে আলো ফেলা হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন রকম আকৃতির আলোকচ্ছটা তৈরি হচ্ছে। কখনো বাঁকা চাঁদ আবার কখনোবা সবুজ উদ্ভিদ। পাশাপাশি চলছে সংগীতের মূর্ছনা। এটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের গায়ে হারবারের ঠান্ডা পানির পরশ এসে লাগল। এরপর আমরা এগোতে থাকলাম বারাংগারুর দিকে। সেখানে যেতে কোকোল যে হার্ফে দেখলাম একটা বেলুন আকৃতি ফুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে পাঁচজন মানুষ হাতে হাত এবং মাথায় মাথা মিলিয়ে একটা গম্বুজের মতো আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এর ভেতরে যেয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। কারণ, মানুষগুলোর অভিব্যক্তি আলোর রং বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল।

আলোকিত হারবার ব্রিজ আর অপেরা হাউস দেখে চাঁদ যেন লজ্জা পেয়েছে
আলোকিত হারবার ব্রিজ আর অপেরা হাউস দেখে চাঁদ যেন লজ্জা পেয়েছে

এরপর আমরা বারাংগারু এসে ফেরিতে উঠলাম। উদ্দেশ্য সার্কুলার কিয়েতে যাওয়া। রাতের ফেরি থেকে সিডনি শহরের আসল সৌন্দর্য দেখা যায়। পানিতে পুরো শহরের ছায়া পড়ে আসলেই একটা সত্যিকারের মায়াপুরী তৈরি করে। পানির ওপরে সোজা শহর আর পানির মধ্যে উল্টো শহর। এ দৃশ্য আমি যতবার দেখি, ততবারই নুতন মনে হয় আমার কাছে। সার্কুলার কিয়েতে যেতে যেতে রাতের সিডনি শহরের কিছু ছবি তুলে নিলাম। আলোকিত সিডনি শহরের ওপরে চাঁদকে দেখে অনেকটা অসহায় লাগছিল। চাঁদের প্রাকৃতিক আলো যেন বৈদ্যুতিক এই আলোকচ্ছটার কাছে হার মেনেছে। সেদিন ছিল পূর্ণিমার পরদিন, তাই চাঁদের উজ্জ্বলতাও ছিল অনেক; তবু ভূমির এই আলোকচ্ছটা থেকে কজনই আর দৃষ্টি ফিরিয়ে চাঁদকে দেখবে।

এরপর আমরা ধনুকের আকারের আলোকিত হারবার ব্রিজ দেখতে পেলাম। তার নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছিল আলোকিত অপেরা হাউস। আমরা ব্রিজ পার হওয়ার সময় দেখলাম ব্রিজের দুই পাশের পিলারেও চলছে আলোর খেলা। আর অপেরা হাউসের কাছে এসে দেখলাম তার জীবন্ত দেয়ালে আলোর খেলা। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস–ঐতিহ্য থেকে শুরু করে কৃষ্টি, সংস্কৃতি সবকিছুর প্রদর্শনী চলছে। আর তার প্রতিবিম্ব পানিতে পড়ে তৈরি হচ্ছে আরও মোহনীয় পরিবেশ। আর সিডনি টাওয়ার থেকে ফেলা হচ্ছে সাত রঙের আলোর রশ্মি। যেটা ছোটবেলায় পড়া বে-নী-আ-স-হ-ক-লার কথা মনে করিয়ে দিল।

প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি আর্টস ভবনের দেয়ালে
প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি আর্টস ভবনের দেয়ালে

এরপর আমরা ফেরি থেকে নেমে সার্কুলার কিয়ের সঙ্গে লাগানো কাস্টমস হাউস বিল্ডিংয়ের দেয়ালে আলোর খেলা দেখলাম। সেখানে ভবিষ্যতের পৃথিবী দেখানো হচ্ছে। যেখানে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে যন্ত্র। এরপর আমরা মিউজিয়াম অব কনটেম্পোরারি আর্টসের দেয়ালে দেখলাম সিডনির সব ঐতিহ্যবাহী জায়গা ও পশুপাখি। সেখানকার শো শেষ হলো উড়ন্ত প্রজাপতি দিয়ে। আমরা জীবনেও এত বড় উড়ন্ত প্রজাপতি দেখিনি। এরপর কোনার জায়গাটার মধ্যে মানুষ আকৃতির কিছু আলোকদণ্ড বসানো ছিল। নিয়ম হচ্ছে তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা। আমরাও সেই আকৃতিগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিলাম। এভাবে হাঁটাহাঁটি করতে করতে আমাদের পেট ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছিল। তাই আবার সার্কুলার কিয়েতে ফিরে এলাম। সেখানকার হাংগ্রি জ্যাকস থেকে খাবার নিয়ে আমরা কাস্টমস হাউসের সামনে বেদিতে বসে পড়লাম। খাওয়া শেষ করে আমরা ফেরার ট্রেনে চড়ি।

পুরো সময়টা সন্তান দুটি হাঁটাহাঁটি করা নিয়ে অভিযোগ করে যাচ্ছিল। কিন্তু ট্রেনে উঠে বলল, বাবা তোমাকে ধন্যবাদ আমাদের নিয়ে আসার জন্য। সেদিন ছিল ভিভিডের একদম প্রথম দিন, তাই ভিড় অনেক কম ছিল। আমাদের হাঁটতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, ওয়ার্কিং ডেতে গেলে একটু ধীরস্থিরভাবে আলোর খেলা উপভোগ করা যাবে। সপ্তাহান্তে গেলে পা ফেলার জায়গা থাকে না।

ভিভিডের আলোয় জীবন্ত কাস্টমস হাউসের দেয়াল
ভিভিডের আলোয় জীবন্ত কাস্টমস হাউসের দেয়াল

আর এবার ড্রোন শো ‘লাভ ইজ ইন দ্য এয়ার’ রাখা হয়েছে মাত্র তিন দিন—৮, ৯ ও ১৫ জুন। এই তিন দিনের কোনো এক দিন গেলে আপনাকে অবশ্যই রাত নয়টার মধ্যে সার্কুলার কিয়েতে ফিরে আসতে হবে। কারণ, ড্রোন শো শুরু হয় ঠিক ৯টা ১০ মিনিটে, চলে মাত্র ১০ মিনিট। ড্রোন শো এখন পর্যন্ত আমার কাছে ভিভিডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বলে মনে হয়েছে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

ভ্রমন সম্পর্কিত সকল নিউজ এবং সব ধরনের তথ্য সবার আগে পেতে, আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদেরকে ফলো করে রাখুন।

© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Customized By ThemesBazar.Com