যেভাবে দুনিয়া কাঁপানো ডলার ছাপা হয়

বর্তমান সময়ে নগদ অর্থ পুরনো মনে হতে পারে, বিশেষ করে যখন ডিজিটাল কারেন্সি বা কার্ড ক্রমেই সহজলভ্য হয়ে উঠছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নগদ অর্থ বেশ কয়েকবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্লাটিনাম কয়েন তৈরির আইডিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

গত ডিসেম্বর মাসেই ট্রেজারি সেক্রেটারি ইয়েলেন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, যখন তিনি টেক্সাসের ফোর্ট ওর্থে নতুন ডলারের নোট ছাপানোর জন্য স্বাক্ষর করতে যান। এর আগে ২৯ জন ট্রেজারি সেক্রেটারি ডলার নোটে স্বাক্ষর করলেও জ্যানেটই প্রথম নারী হিসেবে এ কাজ করেন। তাছাড়া এটি এমন এক বিরল মুহূর্ত, যখন ডলার নোট নতুন করে বানানো হয়। দেখে নেওয়া যাক ডলার নোট বানানোর পুরো প্রক্রিয়াটি।

প্রথম নারী ট্রেজারার সেক্রেটারি হিসেবে মার্কিন ডলারে স্বাক্ষর করেন জ্যানেট ইয়েলেন; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস


স্বাক্ষরসহ ডলারের নতুন নোটের ডিজাইন মেটাল প্লেটে বসানো হয়, যেটিকে প্রিন্টিংয়ের কাজে লাগানো হবে।

নোট তৈরি করার জন্য অভিজ্ঞ ডিজাইনার এবং এনগ্রেভারদের একটি দলকে প্রয়োজন হয়, যারা নোটের ভেতরে থাকা পোর্ট্রেট, ভিনিয়েট, লেটারিং এবং অন্যান্য অর্নামেন্টাল ডিজাইনগুলো করে থাকেন। নিরাপত্তা এবং সৌন্দর্য দুটির কথা মাথায় রেখেই এই ডিজাইন করা হয়।

চলছে প্লেট এনগ্রেভিং করার কাজ; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

একশ বছরেরও বেশ সময় ধরে ব্যবহার করা প্যান্টোগ্রাফ নামের একটি যন্ত্র দিয়ে এনগ্রেভিংগুলোকে প্লেটের ওপর বসানো হয়, যেগুলোকে নোটের ওপর ছাপা হবে।

প্যান্টোগ্রাফ দিয়ে নোটের আকার ঠিক করা চলছে; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

কাগজের নোট ডিজাইন করা বহু বছর পরপর করা হয়, বিশেষ করে যখন নতুন কোনো ট্রেজারি সেক্রেটারিয়েট দায়িত্ব গ্রহণ করে। নতুন সেক্রেটারির স্বাক্ষর সংবলিত নোট বাজারে আসতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। সাধারণত এক আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাক্ষরের কপিটি নিয়ে নেওয়া হয় এবং মেটাল প্লেটে স্বাক্ষরটিকে এনগ্রেভ করা হয়, যেগুলো ডলার নোট তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।

ট্রেজারি সেক্রেটারিদের স্বাক্ষর পড়া বেশ কষ্টকর হয় মাঝেমধ্যে। এ কারণেই স্বাক্ষর করার সময় সেক্রেটারি ইয়েলেন ট্রেজারি সেক্রেটারিদের ‘বাজে হাতের লেখা’ নিয়ে ফাউন্ডিং ফাদারদের আরও চিন্তা-ভাবনা করা উচিৎ ছিল বলে মজা করেন। তার স্বাক্ষর বহুদিন ধরে অনুশীলন করেও এসেছেন বলেও জানান তিনি।

ট্রেজারার সেক্রেটারির স্বাক্ষর; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস


টেকনিশিয়ানরা বড় বড় প্লেট তৈরি করেন যার মাধ্যমে নোটের ডিজাইনকে কাগজের ওপর ছাপা হবে।

কাগজের ওপর প্রিন্টিং শুরু করার জন্য তিন থেকে চারটি মেটাল প্লেটের প্রয়োজন হয়, যেগুলো তৈরি করতে সময় লেগে যায় আট দিন পর্যন্ত। ছবিগুলোকে ‘স্টিল ডাইস’ নামের একটি বিশালাকারের যন্ত্র ব্যবহার করে প্লেটের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়। এরপর প্লেটগুলোকে পরিষ্কার করে পালিশ করা হয়।

চলছে প্লেট পরিষ্কারের কাজ; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

প্লেটগুলোর ডিজাইন ঠিকঠাকভাবে বসেছে কিনা তা নিরীক্ষণ করার পর এগুলোকে প্রিন্টিং প্রেসের ধাক্কা সহ্য করানোর জন্য ক্রোম-প্লেটিং করা হয়। প্লেট থেকে কাগজে ছবি প্রিন্ট করার জন্য প্লেটগুলোকে ৬৫ টন শক্তি নেওয়ার মতো শক্ত হতে হয়।


ডলার প্রিন্ট বেশ কিছু ধাপে করা হয়: প্রথমে পেছনের পাশ প্রিন্ট করে দেখা হয় ঠিকভাবে প্রিন্ট হয়েছে কিনা। এরপর সামনের অংশ প্রিন্ট করা হয়।

কালো এবং রঙ-পরিবর্তনশীল এমন মেটালিক রঙ ব্যবহার করা হয় প্রিন্টিংয়ের কাজে। নোট জাল হওয়ার ভয়ে ব্যুরো অফ এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিং বিভাগের তৈরি এই কালি খুবই গোপনে তৈরি করা হয়।

অফসেট প্রিন্টারের মাধ্যমে দ্রুত গতিতে প্রিন্টিংয়ের কাজ চলছে; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

কাগজটিও তৈরি করা হয় লিনেন এবং তুলার মিশ্রণ দিয়ে, যার মধ্যে আবার লাল ও নীল রঙের ফাইবার মিশিয়ে দেওয়া হয়। নোট জালকে আরও কঠিন করে তোলার জন্য এরপর জলছাপ এবং অন্যান্য রঙের সুতা ব্যবহার করা হয়।

বেশিরভাগ নোট তৈরি করার সময়েই প্রথমেই ঘণ্টায় ১০ হাজার শিট প্রিন্ট করতে সক্ষম এমন হাই-স্পিড অফসেট প্রিন্টারের মাধ্যমে একবার কোটিং করা হয়। এরপর আরও সূক্ষ্ম ডিজাইনগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য ‘ইন্টাগ্লিও’ নামের এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্লেট প্রিন্টিং করা হয়, যেখানে এনগ্রেভিংগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে অন্যান্য রঙের (বিশেষ করে রঙ-পরিবর্তনশীল কালি) ছাপ দেওয়া হয়। তবে এক এবং দুই ডলারের নোটের ক্ষেত্রে অফসেট প্রিন্টিং করা হয় না, সেখানে প্লেট প্রিন্টিংই প্রথম ধাপ।

প্লেট পুনরায় নিরীক্ষণ; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের নোট তৈরি করা দলটি বেশ বড়। ওয়াশিংটন এবং ফোর্ট ওর্থ মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০ কর্মী এবং কর্মকর্তা কাজ করেন। নোট তৈরির পুরো প্রক্রিয়াতেই প্রত্যেকটি ধাপে নিরীক্ষকরা খুব ভালোভাবে এর গুণমান পরীক্ষা করেন। নিরীক্ষকরা দেখেন নোটগুলোতে কালির ছাপ ঠিকঠাকভাবে পড়েছে কিনা, বিশেষ করে কোনো অতিরিক্ত কালির দাগ রয়েছে কিনা। যন্ত্রে খুব বেশি পরিমাণ কালি থাকলে অথবা যথেষ্ট পরিমাণ চাপ না পড়লে এ ধরনের অবাঞ্ছিত দাগ দেখা যায়।

কালি ঠিকঠাকভাবে পড়েছে কিনা তা নিরীক্ষণ করা হচ্ছে; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

সামনের অংশ প্রিন্ট শুরু করার আগে প্লেটগুলো আবারো পরিষ্কার করে পালিশ করা হয়। কোন সূক্ষ্ম জিনিসও এড়িয়ে যাওয়া হয় না। এমনকি ঈগলের একটি পালকের দাগও না পড়লে তা বাদ দেওয়া হয়। প্রতিটি ডলারের ডানপাশে নিচের দিকে থাকা ট্রেজারি সেক্রেটারির স্বাক্ষরও ভালোভাবে নিরীক্ষা করা হয়। শেষমেশ ডলার আঁকা শিটগুলো বের হয়ে আসে প্রেস থেকে।


ম্যাগনিফাইং গ্লাস এবং উন্নত মানের কম্পিউটার প্রযুক্তি করে শেষবারের মতো নোটগুলোর প্রিন্ট পুনরায় নিরীক্ষণ করা হয়।

প্রেস অপারেটররা প্রায়ই প্রিন্ট করার সময়েই শিটগুলো তুলে নিয়ে রঙ আর ডিজাইনে কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা নিরীক্ষা করেন। ট্রেজারি সেক্রেটারির স্বাক্ষরও আবারো দেখা হয়, যাতে কোনো ধরনের দাগ বা ছাপ না পড়ে এবং পরিষ্কারভাবে পড়া যায়।

ডলার ছাপা কাগজের শিট; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

ডলার ছাপানো শিটগুলো এরপর কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় যেটি এর ক্যামেরা এবং সফটওয়্যার দিয়ে পুরোপুরি নিখুঁত এবং খুঁত থাকা শিটগুলোকে আলাদা করে ফেলে। যেগুলোতে খুঁত থাকে, সেগুলোর মধ্যে যে নোটগুলো নিখুঁতভাবে প্রিন্ট করা হয়েছে সেগুলোকে কেটে আলাদা করে বাকি খুঁতযুক্ত নোটগুলোকে নষ্ট করে ফেলা হয়।

কম্পিউটারের মাধ্যমে ঠিকভাবে প্রিন্ট হয়েছে কিনা তা নিরীক্ষণ করা হচ্ছে; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস


প্রিন্টিং কাজের শেষ ধাপে শিটগুলোকে কেটে ডলার নোটের আকারে নিয়ে আসা হয় এবং ফিনিশিং টাচ দেওয়া হয়।

মেশিনের মাধ্যমে খুব দ্রুত নোটের শিটগুলোকে প্রিন্ট করে, নিরীক্ষা করে কেটে আলাদা করে প্যাকেজ করা হয়। শেষ ধাপের প্রিন্টিংয়ে লেটারপ্রেস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুটি সবুজ রঙের সিরিয়াল নাম্বার এবং চারটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ডেজিগনেশন নাম্বার বসানো হয়। একেবারে শেষে ফেডারেল এবং ট্রেজারি বিভাগের সিল ছাপিয়ে দেওয়া হয়।


গিলোটিন কাটারের মাধ্যমে নোটগুলোকে কাটার পর সেগুলোকে ফেডারেল রিজার্ভ ভল্টে পাঠানোর আগে প্যাকেজিং করা হয়।

নোটগুলোকে প্যাকেজ করার জন্য প্রথমে ১০০টি নোটকে একত্র করে এক বান্ডিল নোটকে একটি সাদা রঙের ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, যার ওপর রঙিন কালিতে এটি কত ডলারের নোট তা লিখে রাখা হয়। এরপর আরও কিছু বান্ডিলকে পাশাপাশি রেখে ‘ক্যাশ ব্রিক’ বানানো হয়। তারপর প্রতিটি ব্রিককে একসাথে প্যাক করে ‘ক্যাশ প্যাক’ তৈরি করা হয়, যেখানে প্রতিটি প্যাকেজে ১৬ হাজার নোট থাকে। এই নোটগুলো সার্কুলেশনের জন্য তৈরি হয়ে যায়। এরপর প্যাকগুলোকে ফেডারেল রিজার্ভ ভল্ট এবং সেখান থেকে ব্যাংকগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

প্যাকেজ করা ডলার নোট; ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

জ্যানেট ইয়েলেনের স্বাক্ষরিত নতুন নোটগুলো এই বছরেই বাজারে আসার কথা, তবে ঠিক কোন সময়ে আসবে তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। যদিও মার্কিনদের দৈনন্দিন জীবনের লেনদেনের ৪০ শতাংশই হয় ‘ক্যাশলেস’ পদ্ধতিতে, তারপরেও বর্তমানে ২ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের ডলার নোট সারা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে এবং লেনদেন হচ্ছে।

যদিও বেশিরভাগ মানুষই কখনোই ভাবে না কীভাবে এই নোটগুলো তৈরি হচ্ছে, এই বিশালাকার কাজগুলো প্রদর্শন করে কীভাবে মার্কিন ডলার সারা পৃথিবীতে তাদের প্রভাব টিকিয়ে রেখেছে।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: