1. [email protected] : admin2021 :
  2. [email protected] : cholo jaai : cholo jaai
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী বাঙালির চ্যালেঞ্জ
শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫০ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী বাঙালির চ্যালেঞ্জ

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১

ধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাঙালিরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিপুল সংখ্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। অভিবাসী জীবনে আত্তীকরণ ও অভিযোজনে রয়েছে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। আর্থিক, বৈষয়িক এবং পেশাগত দিকে বিভিন্ন মাত্রায় সাফল্য লাভ সত্যেও নতুন দেশের সংস্কৃতি,‌ সামাজিক ও রাজনৈতিক মূলধারায় অভিযোজনে রয়েছে জানা-অজানা বিপত্তি ও প্রতিকূলতা।

অভিবাসী বাঙালির চেতন এবং অর্ধ-চেতন মানসে বিরাজ করে এক অদ্ভুত সংঘাত। পেছনে ফেলে আসা দেশের সংস্কৃতি বনাম অভিবাসনের নতুন সংস্কৃতি। এই সংঘাতের পথ ধরে বাসা বাধে উৎকণ্ঠা, নৈরাশ্য এবং একাকীত্ব। নতুন দেশ যদি হয় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায়, তাহলে এই সংঘাতের মাত্রা হয় বিচিত্র এবং বহমান। যুক্তরাষ্ট্রে আমার নিজের অভিজ্ঞতার বেদনা এবং মাধুরী মিশায়ে আলোচনা করব অভিযোজনের বিপত্তি ও প্রতিকূলতা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের একটি শব্দ পরিবর্তনের ধৃষ্টতার জন্য প্রথমেই করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিচ্ছি। “আমেরিকার মহামানবের সাগরতীরে” বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও বর্ণের অদ্ভুত মিলনমেলা ক্রমবর্ধিত হারে সক্রিয়মান এবং পরিবর্তনশীল। তথাপি এখানকার গড়পড়তা মূল্যবোধ ও জীবনধারায় রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে সাধারণভাবে গৃহীত উপাদানসমূহ– যার ওপর ভিত্তি করেই আবর্তিত হয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের অমোঘ ধারা। সময়ের অনিরুদ্ধ প্রবাহে নিজের অজান্তে অভিবাসীরা ক্রমশ পরিবর্তনের ধারায় সিক্ত হতে থাকে। কখনও তা ঘটে নিজের অজান্তে। আবার কেউ কেউ রুখে দাঁড়ায় পরিবর্তনের খরস্রোত।

আট হাজার যোজন দূরে এই ভিনদেশ যুক্তরাষ্ট্রে আমি নিজেই এক অভিবাসী। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রার্থিত নির্বাসনে আমি স্বেচ্ছায় শৃঙ্খলিত। এখানে অভিবাসনের নিঃসঙ্গতা, নির্বাসনের বিচিত্র প্রেত হয়ে, আমাকে বিদ্ধ করে ধারালো প্রশ্নবাণে:

এ নির্বাসন কি প্রার্থিত আনন্দধাম?

অথবা অযুত কালের আরাধনার প্রতীক্ষিত এক গোলা ধান?

অথবা ঘৃণিত কারাগার?

… ফুটে উঠে বেদনাহত প্রশ্নের ধারালো কৃপাণ

কুয়াশার ওড়নায় ঢেকে থাকা বিষাক্ত সরীসৃপের মতো।

(কবি মোস্তফা সারওয়ার। কবিতার বই এবং কবিতার শিরোনাম: প্রার্থিত নির্বাসনের উন্মাদ পদাবলী। পৃষ্ঠা ৫১)

আর্থিক, বৈষয়িক এবং পেশাগত সাফল্যের মুঠো মুঠো অঞ্জলি আমি প্রসারিত হাতে ‘শতরঞ্জির ব্যাগে’ লুফে নিয়েছি। পারিবারিক বিজয় বৈজয়ন্তীর দেবী তার সঞ্চয় মুক্ত হাতে ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু তবুও এখানকার নিঃসঙ্গতা এবং বাংলাদেশে ফেলে আসা আনন্দ-বেদনার মধুর স্মৃতি আমাকে সমর্পণ করে এক অনিন্দ্য সৌন্দর্যের তরঙ্গে প্লাবিত বাংলা নামের এক মোহনীয় মানসীর মোলায়েম আঁচলে।

প্রবাসের আনন্দ, বিলাস, আর কর্মদীপ্ত দিনগুলো

নিমেষে একাকার হয়ে যায় …

শুধু ফুটে ওঠে এক মাতাল সংগীত …

জেগে ওঠে এক অতি পৃথিবী

যেখানে বাংলা নামের মেয়েটির চোখে

অভিমানের মেঘ জমে থাকে,

ঠোঁটে থাকে সহস্র বেদনার অমৃত রঞ্জন … অনাবিল লাউ

অথবা মোহাবিষ্ট রামছোর মাছ;

যাঁর কালো চুলে সমর্পিত হয় পৃথিবীর সব হলাহল;

দিনের নিষ্ঠুর কর্মপ্রদাহ, অথবা কনকাঞ্জলি

তার আঁচলের ব্ল্যাকহোলে পড়ে যায় ঢাকা।

(কবি মোস্তফা সারওয়ার। কবিতার বই এবং কবিতার শিরোনাম: প্রার্থিত নির্বাসনের উন্মাদ পদাবলী। পৃষ্ঠা ৫১-৫২)

আমাদের এই অনুভূতিগুলো ক্ষণস্থায়ী। অর্থ উপার্জন এবং কাজের তাগিদে আমাদের সকল প্রয়াস আবার নিয়োজিত হয় অভিবাসী জীবনের প্রতিটি বৈষয়িক শাখা-প্রশাখায়। কিন্তু তবু যেন এক শূন্যতা। একটি শূন্য বৃত্তে আলবে ক্যামুর গ্রিক চরিত্র সিসিফাসের মতো আমাদের বিচরণ। শূন্যতা পূরণের আশায় এবং সাধনায় আমরা খুঁজে বেড়াই এক নিরাপদ আশ্রয়। অনেক সময় অভিযোজনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার বাধা-বিপত্তি প্রতিকূলতাকে জয় না করে আমরা গড়ে তুলি সংস্কৃতির অন্ধকার যুগের এক সমান্তরাল পৃথিবী। মূলধারা থেকে নিদারুণ বিচ্ছিন্ন এক গৌণ পৃথিবী। অভিবাসী দেশের পরিচয় ভুলে অন্য এক আত্মপরিচয়ে আমরা বিভ্রান্ত হই।

আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্ত জল্লাদ এসে আমাদের ঠেলে

দেয় সংস্কৃতির গৌণ পৃথিবীতে।

(কবি মোস্তফা সারওয়ার। কবিতার বই এবং কবিতার শিরোনাম: প্রার্থিত নির্বাসনের উন্মাদ পদাবলী। পৃষ্ঠা ৫২)

আমাদের প্রজন্ম আমাদের অভিবাসী দেশের মুক্ত আলো বাতাসে বড় হতে থাকে। কখনও কখনও আমরা তাদের চারদিকে, প্রজন্মের জন্য বিদেশি কিন্তু অভিবাসীর জন্য স্বদেশী অথচ কূপমণ্ডূক, সংস্কৃতির প্রাচীর তুলে দেই। এর ফলে প্রজন্মের মনন ও মানসিকতায় চলে সংঘাতের নিষ্ঠুর প্রদাহ। অভিযোজন ও আত্তীকরণের মাঝে থেকে যায় নিদারুণ অপঘাত। ফেলে আসা দেশের জীবনধারা অথবা সংস্কৃতির ললিত উপাদান অভিসংশিত দেশের পরীক্ষিত সত্তার সাথে যুগলবন্দী করে এক অপূর্ব মূর্ছনা সৃষ্টি করা থেকে আমরা হই বঞ্চিত।

উপরোক্ত অসঙ্গতির যূপকাষ্ঠে আমরা বলি দিচ্ছি আমাদের প্রথম প্রজন্মের কন্যা সন্তানদের স্বার্থ। মহিমান্বিত, শিক্ষায় উচ্ছ্বাসনে সমাহিত, মানবিক গুনে অলংকৃত আমাদের অনেক কন্যা সন্তানের অবিবাহিত জীবন আমাদের নিয়ত পীড়া দেয়। এজন্য কারা অপরাধী? সমান্তরাল পৃথিবীর গৌণ প্রকোষ্ঠে তাদের বন্দি করেছে কোন সেই কারা প্রহরী? এর জবাবদিহিতার সময় প্রায় উত্তীর্ণ।

এই ব্যর্থতার উত্তর খুঁজে পেতে কম্পিত চিত্তে অবগাহন করব বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইদেগারের রচিত ১৯২৭ সালে প্রকাশিত পুস্তক “বিরাজ এবং সময়” এর বিমূর্ত পাতায়। ব্যক্তি হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব শুধু জৈবিক দেহ ও তার অনুভূতি নয়। হাইদেগার ব্যক্তি মানুষের বিরাজমানতা অথবা অস্তিত্ব প্রকাশে একটি নতুন শব্দ চয়ন করেছেন। তা হল ‘দাসেইন’ (Dasein)। আক্ষরিকভাবে ‘দাসেইন’ এর অর্থ হল “সেখানে থাকার” অথবা “being there”। সেখান থেকে কাজের মাধ্যমে মানুষ হিসাবে সত্তার প্রকাশ। সময়ের প্রবাহে সে সত্তার নিয়ত পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তিত সত্তাটিই ব্যক্তি হিসেবে বিরাজিত। ‘দাসেইন’ অথবা ‘সেখানে থাকার’ সত্তাকে যদি অন্য কোনো দূরাঞ্চলে অর্থাৎ আট হাজার যোজন দূরের কর্ম প্রবাহের দ্বারা প্রভাবান্বিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়– সেক্ষেত্রে ব্যর্থতার বেদনাই হবে মূলতঃ আমাদের অনুষঙ্গ।

যেখানে আমরা বসত গেড়েছি, অভিসংশিত হয়েছি, সেখানের কর্মপ্রবাহে এবং সময়ের চলমান ধারায় ক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার বিকাশই হলো মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের অন্যতম অঙ্গ। অর্থাৎ অভিবাসনের সাথে আত্তীকরণ ও অভিযোজন হবে আমাদের মঙ্গলঘট। তবে ফেলে আসা দেশের লালিত এবং পরীক্ষিত মূল্যবোধের সুষ্ঠু ও সতর্ক সংযোজনার মাধ্যমে আমরা নিজেরা এবং আমাদের প্রজন্ম সফল ও সার্থক “দাসেইন” অর্থাৎ “অভিবাসনে থাকার” সফল অস্তিত্ব লাভ করতে সক্ষম হবে।

এমনি সফল রূপান্তর কি সম্ভব? এর উত্তর খুঁজতে আমি এবার জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক হাইজেনবার্গ এর দ্বারস্থ হব। ১৯২৭ সালে আবিষ্কৃত তার “অনিশ্চয়তা নীতি” কে আমি প্রয়োগ করব সমাজবিজ্ঞানে এবং এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করব অভিবাসী বাঙালির আত্তীকরণ ও অভিযোজনের সমস্যা। আমার দুঃসাহসের জন্য করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটি ক্ষুদ্র কণার অস্তিত্ব জানতে হলে অবস্থান (position) এবং ভরবেগ (momentum) নির্ণয় করতে হয়। “যত নির্ভুলভাবে অবস্থান নির্ণয় করা যায়, ভরবেগ জানা হয়ে পড়ে ততটাই অনিশ্চিত।” এই নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও কারিগরি জগতে বিপ্লব ঘটেছে। এই নীতিকে ভিত্তি করে নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা উপভোগ করেছি টেকনোলজির চমৎকার সরঞ্জামগুলো।

এখন পুনরায় আসা যাক অভিবাসনে। অভিবাসনে সফলতার মূল্যায়নে প্রয়োজন দুটি উপাদানের যথাযথ নির্ণয়, সম্পর্ক নির্ধারণ এবং সফল প্রয়োগ। এ দুটো উপাদান হলো: অভিবাসনে আত্তীকরণ এবং ফেলে আসা দেশের পরম মূল্যবোধ। অভিবাসনের আত্তীকরণ যত নির্ভুলভাবে অর্জন করা হবে, ততই ফেলে আসা দেশের পরম মূল্যবোধ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার ফেলে আসা দেশের পরম মূল্যবোধ যতই কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে, আত্তীকরণ ততটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এই টানাপোড়নের বন্ধুর পথ চলতে চলতে অভিবাসীদের বিভিন্ন মাত্রায় আত্তীকরণ ঘটে। প্রজন্মের ওপরও এর বোঝা ভর করে। এই দুটি উপাদানকে সুষ্ঠু আনুপাতিক হারে গ্রহণ করে অভিবাসী জীবনে তাৎক্ষনিক আমেরিকান বাঙালি ‘দাসেইন’ হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। অবশ্য সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে আত্তীকরণই মুখ্য হয়ে প্রভাব বিস্তার করে। অদৃষ্টের পরিহাস, আমার পৌত্রের কাছে আমার বাংলা লেখাগুলো, আমার বাংলা সংস্কৃতি ও জীবনবোধ হয়তো অজ্ঞেয় হয়ে থাকবে চিরকাল– হয়তো অজ্ঞেয় হয়ে থাকবে ধূয়াশার অন্তরালে। মনে পড়ছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা “কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও”।

মোস্তফা সারওয়ার

এমেরিটাস অধ্যাপক এবং সাবেক উপ-উপাচার্য- ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স, ডিন এবং সাবেক উপাচার্য-ডেলগাডো কমিউনিটি কলেজ, কমিশনার-রিজিওনাল ট্রানজিট অথরিটি, বিজ্ঞানী এবং কবি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com