1. b_f_haque70@yahoo.com : admin2021 :
  2. editor@cholojaai.net : cholo jaai : cholo jaai
মেঘ-পাহাড়ের দেশ শিলংয়ের পথে পথে
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১১:৩৪ অপরাহ্ন

মেঘ-পাহাড়ের দেশ শিলংয়ের পথে পথে

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি বাঁকের পরে বাঁক পেরোনোর রহস্য দেখতে চাইলে যেতে হবে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এ। রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখায় শিলংয়ের কথা এসেছে বার বার। তখনই সিদ্ধান্ত নিই শিলং যাবোই। তাই খোঁজ খবর করছিলাম অনেকদিন ধরেই। কল্পনায় ছিলো আঁকাবাকা পাহাড়ী রাস্তা, ঘন সবুজ বন,কখনো বা উচ্ছল ঝর্ণা, কিন্তু মেঘ পাহাড়ের সঙ্গে, ওক, পাইন, ক্রিসমাস-ট্রি আর হালকা বেগুনি আভার চেরীফুলও যে স্বাগত জানাবে শিলং-এ সেটা কল্পনায় ছিলোনা সে গল্প পরে বলবো।

শিলং ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা অনেক দিনের। সময় সুযোগ মিলিয়ে শাওন, বীনা, হিমু, শ্রাবন্তী, আর আমি চললাম শিলংয়ের উদ্দেশে।

আমরা ঢাকা থেকে রওনা হলাম রাত পৌনে ১২ টার গাড়িতে। পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় পৌঁছালাম সিলেটে। সেখান থেকে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে তামাবিল সীমান্ত। বর্ডারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে উঠে পড়লাম ভাড়া করা জিপে।  যারা ঘুরতে যাবেন তাদের সুবিধার জন্য জানিয়ে রাখি ৮জনের গাড়ির ভাড়া পড়বে পাঁচটি স্পটসহ দেখাসহ ৪৫০০ রুপি। আর ছোট গাড়ির ভাড়া পড়বে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। তবে যদি কোথাও না থেমে সরাসরি শিলং শহরে যান সেক্ষেত্রে ভাড়া আরো কম পড়বে। বর্ডার থেকে সরাসরি শহরে যেতে সময় লাগে আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা। বর্ডারের ঝামেলা শেষ করে আমরা  চললাম শিলংয়ের পথে।

তামাবিল বর্ডার থেকে শিলং শহরের দুরত্ব ৮৩ কিলোমিটার। বর্ডার পেরিয়ে একটু পথ যেতেই চোখে পড়বে স্বচ্ছ সবুজ  পানির নদী ডাউকি। চাইলে ঘণ্টা খানেক নৌকা ভ্রমন করে অনায়াসে কাটিয়ে নেয়া যায় পথের ক্লান্তি। সাথে বাড়তি পাওনা দারুন কিছু ছবি।

গাড়ি ঠিক করেছিলাম স্পট দেখা সহ শিলং শহরে যাওয়া। ৫ টি স্পট দেখে শহরে পৌঁছাতে বেজে গিয়েছিলো রাত সাড়ে আটটা।

শিলং যাওয়ার পথে প্রথমেই নেমে পড়লাম ডাউকি নদীতে। যারা জাফলং গিয়েছেন দূরে ভারত অংশে যে  ব্রীজ আক্ষেপ ছড়িয়েছে মনে, সেটিই ডাউকি নদীর উপর ডাউকি ব্রীজ। খাড়া ঢাল এবড়ো থেবড়ো সিড়ি ভেঙে যখন সবুজ শীতল জলে পা ভেজালাম মনে হল স্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছি। সারা রাতের ভ্রমণ ক্লান্তি ডাউকি নদীকে দিয়ে গেলাম। ঘাটে বাঁধা সারি সারি নৌকার যে কোন একটা ভাড়া করে যখন বেশ খানিকটা দূরে যাবেন, দেখবেন ছোট ছোট বিচিত্র রকমের মাছ পানির একবারে উপর দিয়ে ভেসে চলেছে। সবুজ পানি ভেদ করে দেখা যাচ্ছে নীচের স্বচ্ছ সাদা বালু ছোট বড় পাথর।

এরপর আঁকাবাকা পথ সবুজ গাছের সারি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম উমক্রেম ঝর্ণায়। উপরের সাদা জলের ধারা নীচের খাদে পড়ে কিভাবে সবুজ পানির লেকের মত তৈরি হয়েছে, সেই বিস্ময় নিয়েই কাটলো বেশ খানিকটা সময়। পানিতে পা ডুবিয়ে কাটিয়ে দিলাম আরো খানিকটা সময়।

এরপরের গন্তব্য বোরহিল ঝর্ণা। অনেক উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র গতিতে গড়িয়ে পড়া সাদা জলের ধারা ভেতরে তৈরি করলো অন্যরকম এক ভালো লাগা। ব্রীজের উপর দাড়িয়ে বেশ খানিকটা সময় কাটলো স্বচ্ছ জলের ধারার পাথরের বুকে আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখে। কেউ কেউ আবার সেখান থেকেই খাবার পানি বোতলে ভরে নিলো।

আমাদের পরের গন্তব্য লিভিংরুট ব্রিজ। এই ব্রীজে যাবার পথটাও বেশ কষ্টের। ঢালু সিড়ি বেয়ে নীচে নামতে নামতে শুনলাম ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মত শব্দ। দিনের বেলায় ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে ভেবে অবাক লাগলো। কিন্তু স্থানীয়রা জানালো এটা পোকার শব্দ নয়। পাহাড়ি এক ধরনের জংলি ফল পাকার সময় ফল ফাটতে শুরু করলে এরকম শব্দ হয়। সিড়ি বেয়ে নীচে নামতেই চোখ ছানাবড়া। দুটো গাছের শেকড় কিভাবে যাত্রাপথ তৈরি করেছে সেই বিস্ময়েই কাটলো বহুক্ষণ। লিভিংরুট ব্রীজের নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে বরফ শীতল জলের ধারা সেখানে হাত মুখ ধুয়ে মুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে গেলাম।

এরপর রওনা দিলাম দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিনং পাড়ার উদ্দেশ্যে। সারি সারি বিচিত্র রঙের ফুল দুপাশের ঘন সবুজ গাছ চোখের প্রশান্তি এনে দিলো মুহুর্তেই। এখানে দেখা মিললো বিচিত্র এক গাছের, যার নাম কলসপত্রী এই গাছের আরেক নাম পতঙ্গভোগী। পোকা মাকড় গাছে পড়া মাত্রই গাছ সেটা খেয়ে ফেলে।

এছাড়াও রাস্তার দু’পাশ জুড়েই নাম না জানা ফুলের সমারোহ মনে এনে দেবে প্রশান্তি। এখানেই দেখতে পেলাম শতবছরের পুরনো চার্চের।

বেশ কিছুটা সময় পার করে রওনা হলাম শিলং শহরের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যামে ক্লান্ত হয়ে যখন শহরের কাছাকাছি পৌঁছালাম মনে হলো পাহাড়ের গাঁয়ে জ্বলে থাকা জোনাকীরা আমাদের অভ্যর্থনায় প্রস্তুত। অন্যরকম এক ভালোলাগায় মনটা ভরে গেলো।

দ্বিতীয় দিনে আমাদের গন্তব্য পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল এলাকা চেরাপুঞ্জিতে। মালকিন পয়েন্ট থেকে রওনা দিলাম চেরাপুঞ্জির পথে। শিলং শহর থেকে চেরাপুঞ্জির দুরত্ব ৬৭ কিলোমিটার। কোথাও যাত্রা বিরতি না দিলে সময় লাগে ২ ঘণ্টা। কিন্তু আমরা সব স্পট দেখতে দেখতে গিয়েছি তাই আমাদের হিসাব ভিন্ন। যারা বেড়াতে যাবেন তাদের জন্য জানিয়ে রাখি ৭টি স্পটসহ চেরাপুঞ্জিতে যাবার গাড়ি ভাড়া ২ হাজার ৫০০ রুপি। যাওয়া আসা এক গাড়িতে করলে খরচ পড়বে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার রুপি।  যাবার পথে চোখে পড়বে সারিসারি ঝাউ, ওক আর পাইনের বন। সাথে বাড়তি পাওনা নাম না জানা পাহাড়ি ফুল। আর বাঁক পেরোলেই হঠাৎ বেগুনি আভার চেরী ফুল মন ভালো করবে নিশ্চিত।

পাহাড়ের ঢালে বাড়ি কোথাও বা ধাপ চাষ। শহর থেকে বেরোনোর মুখে চা বাগান পড়বে চোখে। চাইলে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন বাগানে। প্রথমেই আমরা দেখলাম মগডেক ভ্যালি, এটাকে জিপলাইনার পয়েন্টও বলে। জিপ লাইন হচ্ছে দুটো পাহাড়ের মধ্যে তার বেয়ে চলা।

এরপর গেলাম ওয়াকাবা ফলসে। যাবার পথটা কষ্টকর, তবে একবার পৌঁছতে পারলে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে অপার্থিব সৌন্দর্যে। খুব এনার্জি না থাকলে না যাওয়াই ভালো, অন্তত ১০০ সিড়ি বাইতে হবে না। এখানে চাইলেই ৫০ রুপির বিনিময়ে সাজতে পারবেন খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে। চারদিকে গাঢ সবুজ পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনী নদী পাথরের বুক থেকে আছড়ে পড়া সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিত। যাত্রা পথেই পড়লো  রামকৃষ্ণ মিশন।

এরপর বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম নোয়াকালিকা ফলসে। চারিদিকের ঘন সবুজ পাহাড় তারই বুক চিরে বয়ে চলেছে নোয়াকালিকা ফলস। ঝর্ণার পানি যেখানে গড়িয়ে পড়ছে, সেখানে তৈরি হয়েছে সবুজ পানির ছোট্ট জলাধার।

এরপর আরো খানিকটা পথ পেরিয়ে গেলাম ইকোপার্কে। দুপাশের সবুজের সমারোহ পেরিয়ে যেখানে পার্কের শেষ সীমা, সেখানেই পাথুরে পাহাড়ে দাড়িয়ে সামনের সবুজ পাহাড় যখন দেখবেন তখন নিজেকে জগৎ সংসার থেকে মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন মনে হবে।

পরের গন্তব্যের জন্য আমাদের সবার আগ্রহটা ছিলো প্রবল। প্রথমবার শত বছরের পুরনো গুহার মধ্য দিয়ে যাবার ভৌতিক অভিজ্ঞতা নিতে সবাই উদগ্রীব। স্থানীয়রা গুহার নাম দিয়েছে মসমাই কেভ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে যখন গুহার ভেতরে ঢুকলাম সে এক অন্য রকম রোমাঞ্চ। বড় বড় এবড়ো থেবড়ো পিচ্ছিল পাথরের উপর দিয়ে যাবার সময় কখনো কুঁজো হয়ে বসতে হচ্ছে, কখনো বা কারো সাহায্য নিতে হচ্ছে। মনে হলো রুপকথার রাক্ষসপুড়িতে এসে পরেছি। ব্রিটিশ আমল থেকেই রয়েছে এই প্রাকৃতিক গুহা। গুহার এপার থেকে ওপারে যেতে সময় লাগে প্রায় ২০ মিনিট। এই বিশ মিনিটেই পয়সা উশুল মনে হবে।

চেরাপুঞ্জিতে আমাদের শেষ স্পট সেভেন সিষ্টার ওয়াটার ফলস। রাস্তার দুপাশের সবুজ রেখে মাঝখান দিয়ে গাড়ি ছুটে চলার সময় মাঝে মাঝে মেঘ এসে যখন ভিজিয়ে দেবে তখন মন ভরে উঠবে অন্যরকম ভালোলাগায়। সেভেন সিষ্টার ওয়াটার ফলস হচ্ছে পাশাপাশি ৭টি ঝর্ণা, ভরা বর্ষার রুপ এত অপূর্ব যা বর্ণনা করা যায়না। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন মেঘ ঢেকে দিয়েছে ঝর্ণাগুলোকে। তখনও বেশ কিছু পর্যটক দাঁড়িয়ে আছে ভিউ পয়েন্টে, তারা জানালো মাত্র  ৫ মিনিট আগেই দেখা যাচ্ছিলো ঝর্ণা। আমরাও হাল ছাড়বার পাত্রী নই, অপেক্ষা করলাম। আধাঘণ্টা পর মেঘের আড়াল ভেদ করে উঁকি দিলো স্বচ্ছ জলের ধারা। ঘন সবুজ রঙের পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সাদা রঙের জলের ধারা। ক্যামেরায় এবং হৃদয়ে ধারণ করে নিলাম সেই অপরুপ সৌন্দর্য। আবার যাত্রা শুরু করলাম শিলং এর উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝেই মেঘ এসে ভাসিয়ে নিচ্ছিলো আমাদের। সন্ধ্যার পর যখন শিলংয়ে ঢুকলাম আবারও পাহাড়ের গায়ে জ্বলে থাকা আলো মনটা ভরিয়ে দিলো।

পরের দিনের ঘোরাঘুরি শিলং শহরে। দারুণ সুন্দর এলিফ্যান্ট ফলস দেখে গেলাম লেডি হাইডারি পার্কে। ঘুরে দেখলাম নানা রকম ফুলের সমাহার। এখানে শিশুদের আনন্দ দেবার জন্য আছে ছোট্ট চিড়িয়াখানা, স্লিপার দোলনা আরো অনেক কিছু। এরপর সোজা ওয়ার্টস লেকে গিয়ে পৌঁছালাম। লেকের স্বচ্ছ পানিতে বোর্টিং করে কাটলো খানিকটা সময়।
পরের গন্তব্য গলফ ক্লাব সবুজ কার্পেটে পা ছড়িয়ে বসে উপভোগ করলাম প্রকৃতির আসল রুপ।

সবশেষ গন্তব্য ক্যাথেড্রাল ক্যাথলিক চার্চ। রোববার হওয়ায় প্রার্থনারত অনেকের সঙ্গেই দেখা হল। শেষ বিকেলের আলোয় চার্চের ঘণ্টাধ্বনি ভেতরে এক মাদকতা তৈরি করল।

বিদেশি বলে আমরা দেখতে পাইনি শিলং পিক। রোববার হওয়ায় বন্ধ ছিলো ডানভাসকো মিউজিয়াম ও ষ্টেট মিউজিয়াম। পরের বারের জন্য তাই রেখে এলাম।পুরো শিলং জুড়েই ভালোলাগার যে আবেশ তা আমার মনে গেঁথে রইবে অনেক দিন। যেদিন ফিরছিলাম প্রকৃতি যেন দুহাত মেলে তার সৌন্দর্য তুলে ধরলো আমাদের সামনে। মাঝখানের কালো রাস্তা দুপাশের সবুজ সব ঢেকে দিচ্ছিলো মেঘে, আবার রোদ এসে আলোর ঝলকানিতে আলোকিত করে দিচ্ছিলো চারপাশ।

সোনিয়া স্নিগ্ধা

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com