বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

বিপুল খরচ করে রহস্যময় বিমানবন্দর বানাল পাকিস্তান

  • আপডেট সময় বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

ঝাঁ-চকচকে বিমানবন্দর। কী নেই সেখানে! বিলাসবহুল লাউঞ্জ থেকে শুরু করে গাড়ি রাখার বিশাল পার্কিং লট। তাকলাগানো ফুড কোর্ট, রেস্ট রুম। অভাব শুধু দু’টি জিনিসের। সেখানে ভুলেও আসেন না কোনও যাত্রী। ফলে উদ্বোধনের পরেও সেখান থেকে উড়ছে না কোনও উড়োজাহাজ।

দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের গ্বদর। গত বছরের অক্টোবরে রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আরব সাগরের কোলের শহরটিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করে শাহবাজ় শরিফ সরকার। এর নির্মাণে যাবতীয় খরচ করেছে চিন। সেই অঙ্ক ২৪ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে।

ইসলামাবাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্বদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীধারণ ক্ষমতা চার লক্ষ। কিন্তু তার পরও আর্থিক বিশ্লেষকেরা প্রকল্পটির প্রশংসা করতে নারাজ। কারণ, বালুচিস্তানের আরব সাগর লাগোয়া ওই শহরে রয়েছে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের মারাত্মক সমস্যা। বিমানবন্দরে আলো জ্বালাতে তাই ভরসা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের পাওয়ার গ্রিড বা সৌর প্যানেল।

দ্বিতীয়ত, আর্থিক দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া প্রদেশে ওই বিমানবন্দর তৈরি করেছে চিন। গ্বদরের লোকসংখ্যা আনুমানিক ৯০ হাজার। তাঁদের প্রায় কারও বিমানের টিকিট কাটার মতো ট্যাঁকের জোর নেই। উল্টে বালুচিস্তানে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। প্রায়ই পাক ফৌজকে নিশানা করে তারা। পরিস্থিতি দেখেশুনে গ্বদর যাওয়ার কথা মুখে আনছেন না বিদেশিরাও।

গ্বদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধনের সময়ে এটিকে শাহবাজ় সরকারের সাফল্য বলে উল্লেখ করে ইসলামাবাদ। শুধু তা-ই নয়, গোটা প্রকল্পটিকে ‘বন্ধু’ চিনের উপহার হিসাবে দেখছিল তারা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যুতে পাল্টা বিবৃতি দেয় বেজিং। গ্বদর বিমানবন্দর নির্মাণের অর্থ ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে বলে সেখানে স্পষ্ট করে ড্রাগন। এতে পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক।

এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আজ়িম খালিদ। তাঁর কথায়, ‘‘বিমানবন্দরের মালিকানা আছে চিনের হাতে। এর সঙ্গে পাক সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই। বালুচিস্তানের গ্বদরে নিজের দেশের নাগরিকদের নিয়ে আসতেই এটি নির্মাণ করেছে ড্রাগন।’’

২০১৩ সালে বেজিঙের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে ‘চিন পাকিস্তান আর্থিক বারান্দা’ (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বা সিপিইসি) চুক্তি করে ইসলামাবাদ। প্রাথমিক ভাবে এতে ৪,৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হলেও পরবর্তী কালে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার কোটি ডলারে।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পশ্চিম চিনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় থেকে শুরু হয়ে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের কারাকোরাম পেরিয়ে ১,৩০০ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা শেষ হবে গ্বদর সমুদ্র বন্দরে। এই সুদীর্ঘ সড়কপথকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অঙ্গ বলে জানিয়েছে বেজিং। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই পাক সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে বালুচিস্তানে অত্যাচারের অভিযোগ। ফলে সেখানে দানা বেঁধেছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। এতে সিপিইসি অনুঘটকের কাজ করছে বলে মনে করেন বিশ্বের তাবড় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা। পাক ফৌজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটিকে কর্মরত চিনা শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারদেরই লাগাতার নিশানা করে চলেছে বিদ্রোহী বালুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ।

পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের তালিকায় রয়েছেন বালুচ নাগরিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। মিলছে না বেঁচে থাকার ন্যূনতম সরকারি সুযোগ-সুবিধা। তবে গ্বদরের চিনা বিনিয়োগ রক্ষা করতে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছেন রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তারা। বন্দর শহরে বসেছে চেকপয়েন্ট, কাঁটাতারের বেড়া, ব্যারিকেড এবং ওয়াচ টাওয়ার। পাশাপাশি বিপুল সৈনিক মোতায়েন করা হয়েছে সেখানে।

বালুচ জনতার এই অভিযোগ মানতে নারাজ ইসলামাবাদ। উল্টে বিএলএকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে ঘোষণা করেছে পাক ফৌজ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনা শ্রমিক এবং ভিআইপি চলাচলের অছিলায় সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চার দিন বন্ধ থাকে গ্বদর শহরের মূল রাস্তা। এতে ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর।

গ্বদরে আসা সাংবাদিকদের উপরেও পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের নজরদারি করার অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের কেউ শহরের মাছের বাজারে ঢুকলে তো আর রক্ষা নেই। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম কর্মীকে একরকম তুলে নিয়ে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের ভূরি ভূরি নজির রয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের কাছে নিজেদের দুরবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন ৭৬ বছরের গ্বদরবাসী খুদাবক্স হাশিম। তাঁর কথায়, ‘‘একটা সময়ে গ্বদর লাগোয়া পাহাড়ে বা গ্রামে সারা রাত ধরে আমরা পিকনিক করতাম। তাতে কতই না মজা হত! আর এখন তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে ১০ পা গেলে বলতে হয়, আমি কে বা কোথা থেকে কী উদ্দেশ্যে এসেছি। এর থেকে লজ্জার আর কিছু নেই।’’

গত শতাব্দীর ৪০-এর দশকে গ্বদর ছিল ওমানের অংশ। ‘‘এখানে নোঙর করত অধিকাংশ মুম্বইগামী জাহাজ। বন্দর শহরের কেউ খালি পেটে ঘুমোতে যেতেন না। পুরুষেরা সহজেই কাজ পেতেন। পানীয় জলেরও কোনও অভাব ছিল না। এখন তো চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সবটাই লুটতে বসছে পাক সরকার।’’ রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন খুদাবক্স হাশিম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেওয়া এবং বছর বছর খরার জেরে গ্বদরের জল শুকিয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে অবশ্য শাহবাজ় সরকারের কোনও হেলদোল নেই। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, সিপিইসি প্রকল্পে দু’হাজার প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। যদিও বালুচিস্তানের সিংহভাগ বাসিন্দাই এই তথ্যকে অসত্য বলে দাবি করেছেন।

মূলত স্থানীয় বিদ্রোহীদের দাপাদাপির কারণেই গ্বদরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারছে না পাক প্রশাসন। সেখানকার নবনির্মিত বিমানবন্দরটি থেকে পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর তথা সিন্ধ প্রদেশের রাজধানী করাচিতে যাওয়ার বিমান রয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন এই রুটে বিমান পরিষেবা চলবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। যাত্রীর অভাবে বর্তমানে এই রুটে সপ্তাহে এক দিন মিলছে পরিষেবা।

গ্বদরের থেকে বালুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার দূরত্ব কয়েকশো মাইল। এই রুটে কোনও উড়ান চালু করা হয়নি। রাজধানী ইসলামাবাদ পর্যন্তও যাচ্ছে না সরাসরি কোনও বিমান। এগুলিকে বিমানবন্দরটির থেকে যাত্রীদের মুখ ফিরিয়ে থাকার অন্যতম বড় কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা।

গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে বালুচিস্তানে চলছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। অসন্তোষ দানা বাঁধার পর থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশটির হাজার হাজার যুবককে পাক গুপ্তচরেরা গুমখুন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সমস্ত ঘটনা সেখানকার অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিমানবন্দরটির যাত্রী-আকর্ষণ হারানোর নেপথ্যে এই কারণটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নিরাপত্তার কারণে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির উদ্বোধনও পিছিয়ে দেয় ইসলামাবাদ। জায়গাটি পাহাড়ের কোলে হওয়ায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালীন বিএলএ সেখানে হামলা চালাবে বলে মনে করা হয়েছিল। আর তাই সশরীরে এসে এর দরজা যাত্রীদের জন্য খোলেননি পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ। ভার্চুয়াল মাধ্যমেই উদ্বোধন সারেন তিনি। একই পন্থা অবলম্বন করেন চিনা প্রধামন্ত্রী লি কিয়াংও।

গ্বদরের আগে বিশ্বের সবচেয়ে ফাঁকা বিমানবন্দরের তকমা পায় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের নামাঙ্কিত ওই বিমানবন্দরটি তৈরি করতে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি খরচ করেছিল কলম্বো। এর মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকাই দিয়েছিল চিনের এক ব্যাঙ্ক।

হাম্বানটোটা বিমানবন্দর নির্মাণকে ‘সাদা হাতি পোষা’র শামিল বলে ব্যাখ্যা করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। এর জেরে মারাত্মক ভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে লঙ্কা সরকার। একটা সময়ে দ্বীপরাষ্ট্রটি দেউলিয়া পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে বিমানবন্দরটিকে যৌথ ভাবে চালাতে ভারত এবং রাশিয়ার হাতে তা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে কলম্বো। এ ব্যাপারে দুই দেশের সঙ্গেই চলছে আলোচনা।

একই কায়দায় নেপালের পোখরায় বিমানবন্দর তৈরি করেছে চিনা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। এর জন্য বেজিঙের থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কাঠমান্ডু। পোখরার ওই বিমানবন্দরও যাত্রীর অভাবে ধুঁকছে। ফলে গ্বদরে ড্রাগনের তৈরি বিমানবন্দর পাক অর্থনীতিকে কবরে পাঠাবে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞের দল।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

ভ্রমন সম্পর্কিত সকল নিউজ এবং সব ধরনের তথ্য সবার আগে পেতে, আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদেরকে ফলো করে রাখুন।

© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Customized By ThemesBazar.Com