1. b_f_haque70@yahoo.com : admin2021 :
  2. editor@cholojaai.net : cholo jaai : cholo jaai
পর্যটন বদলে দিয়েছে শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০৫:০৯ পূর্বাহ্ন

পর্যটন বদলে দিয়েছে শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় বুধবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল। অনেকগুলো চা বাগান আর বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্যের কারণে খ্যাতি রয়েছে মৌলভীবাজারের এই উপজেলার।  এছাড়া রেল যোগাযোগ ভাল থাকায় অতীতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ছিল মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম বানিজ্যিক এলাকা। কিন্তু আশির দশক থেকে অন্যসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার সাথে সাথে এই জৌলুস হারায় শ্রীমঙ্গল। তবে বর্তমান শতাব্দিতে এই চিত্র বদলে গেছে পুরোপুরি।

পর্যটন বদলে দিয়েছে শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি। এখনাকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখন অনেকটাই পর্যটন নির্ভর। গত ২০ বছরে পর্যটন হয়ে ওঠেছে শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। স্থানীয় প্রশাসনের হিসেবে, শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন ৫ হাজার পর্যটক আসেন।

চা বাগানের পাশাপাশি আগে আনারস, লেবুসহ কৃষির পণ্য উৎপাদনে শ্রীমঙ্গলের ব্যবসায়ীরা আগ্রহী থাকলেও বর্তমানে অনেকে নিজেদের লেবু বাগান, আনারস বাগানের ব্যবসা বদলে এসেছেন পর্যটনসংশ্লিস্ট ব্যবসায়। দ্রুত প্রসার ঘটছে এই খাতের। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এসব মানুষের উপর নীর্ভরশীল তাদের পরিবারের লাখো সদস্য।

শ্রীমঙ্গল ঘুরে বিভিন্ন জনের সাথে আলাপ করে এর সত্যতা উঠে এসেছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধনগর গ্রামের শামছুল হক। একসময় মুদি দোকানের পাশাপাশি লেবু বাগান গড়ে তুলেন। কিন্তু দিনে দিনে শ্রীমঙ্গল পর্যটন সমৃদ্ধ হওয়ার সাথে বুঝতে পারেন এই খাতে ব্যবসা হতে পারে লাভজনক।

তাই পরীক্ষামূলকভাবে ২০০৭ সালে লেবু বাগানের ভেতরে এক রুমের একটি ইকো কটেজ করেন। ভাবনার চেয়েও বেশী সারা পাওয়ায় পরে ৩টি কটেজ গড়ে তুলেন তিনি। ২০১৮ সালে এই কটেজের সামান্য দূরে ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আরেকজনের সাথে মিলে নির্মাণ করেন আরও ৫টি কটেজ।
সব মিলিয়ে অর্থনৈতিকভাবে এখন সফল তিনি। পাশাপাশি তার এখানে সরাসরি এবং আউটসোর্সিংএর মাধ্যমে ৩০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গাড়ির চালক, ট্যুর গাইডসহ অন্তত ২০০ মানুষের জীবিকার উৎস এখন এই কটেজগুলো।

শামছুল হকের মতো বিনোয়গ করতে না পারলেও পর্যটন বদলে দিয়েছে রাসেলের জীবনও । রাসেল আলম লেখাপড়ার পাশাপাশি গৃহশিক্ষক হিসেবে নিজের জীবন শুরু করেন। এরই মধ্যে ২০০৫ সালে আকৃষ্ট হলেন ইকো ট্যুরিজমের প্রতি। ট্রেনিং নিয়ে ট্যুর গাইড হিসেবে নতুন জীবন শুরু করলেন। কিছু দিনের মধ্যেই আয় দাঁড়ায় কয়েকগুণে।

বর্তমানে পর্যটন মৌসুমে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। রাসেল জানালেন তার আশেপাশে এমন অন্তত ১৫ জন গাইড আছেন যাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে পর্যটন।

অন্যান্য ব্যবসাও গড়ে উঠেছে পর্যটকদের ঘিরে। তাদের মূল ক্রেতা ঘুরতে আসা পর্যটকরাই। চায়ের জন্য বিখ্যাত শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসলে পর্যটকরা ফেরার পথে চা পাতাও কিনে নিয়ে যান।

আগে থেকে বেশ কিছু চা পাতার দোকান থাকলেও গত ২ বছরে তা বেড়েছে কয়েকগুণ। স্টেশন রোড, ভানুগাছ রোডসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সারিসারি চা পাতার দোকান। একটি উপজেলা শহরে এতগুলো চা পাতার দোকান মূলত পর্যটকদের জন্যই। এতো চা পাতার দোকান হলেও বিক্রি ভালোই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

চা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফাহিম এন্টারপ্রাইজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, শ্রীমঙ্গলে বৈধ এবং অবৈধ মিলে অন্তত ২শ’ চা পাতার দোকান রয়েছে। পর্যটকরাই এইসব দোকানের মূল ক্রেতা। ২শ’ দোকানের ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কয়েক হাজার উপকারভোগী রয়েছেন। একটা সময় যারা ছোট ছোট বিভিন্ন ব্যবসা করতেন তারাও এখন চা পাতার ব্যবসার দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।

এর বাইরে সব ধরনের ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন পর্যটকদের থেকে। শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এ এস এম ইয়াহিয়া জানান, আমাদের সমিতিতে নিবন্ধনকৃত ২ হাজারের বেশী ব্যবসায়ী আছেন। এদের সবাই কোন না কোন ভাবে পর্যটন থেকে লাভবান হচ্ছেন। ক্রেতাদের সার্কেল বা স্থানীয় অর্থনীতির চাকা যেভাবে ঘুরছে তার চালিকা শক্তি পর্যটকরা। একজন পর্যটক যখন একজন রিক্সা চালককে ৫০টাকা দেন সেই চালক সেখান থেকে ১০টাকা খরচ করছে পাড়ার চায়ের দোকানে। সে হিসেবে এই অর্থনীতির অংশ উপজেলার প্রতিটি মানুষ।

নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী খাসিয়া সম্প্রদায়ের নেতা সাজু মারছিয়াং জানান, এক সময় তার আয়ের উৎস ছিল পান চাষ। বর্তমানে তার ২টি জিপ রয়েছে। যেগুলো পর্যটক পরিবহন করে। তার মত তাদের সমাজের অনেকেই পর্যটনসংশ্লিস্ট ব্যবসার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

তিনি আরও জানান, কয়েকশ’ জিপ গাড়ি রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। এসব জিপ একসময় লেবু, আনারসসহ বিভিন্ন কাঁচামাল পরিহনে ব্যবহৃত হতো। দিন শেষে আয় হতো ৫০০-৬০০ টাকা।  কিন্তু বর্তমানে এই সব জিপের বড় একটি অংশ পর্যটক নিয়ে ঘুরে। ফলে বেড়েছে আয়। বর্তমানে তারা দিনে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় করতে পারেন। এছাড়া প্রাইভেটকার-সিএনজিচালিত আটোরিকশাও এখন নীর্ভরশীল পর্যটকদের উপর। কর্মসংস্থান হয়েছে শত শত চালকের।

চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল শহরে এখন পা বাড়ালেই দেখা মিলে খাবারের রেস্টুরেন্টের। এই সব রেস্টুরেন্টের বেশীর ভাগ নির্ভরশীল পর্যটকদের উপর।

এসবের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে তরুণ-তরুনীরাও আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন পর্যটন থেকে। বাইরের অতিথিরা শ্রীমঙ্গল আসার আগেই এদের মাধ্যমে হোটেল-রিসোর্ট বুকিং দিচ্ছেন। ডিজিটাল মার্কেটিং করে তারা আয়ের পথ পেয়েছেন।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার আহ্বায়ক আবু সিদ্দিক মুসা জানান, শ্রীমঙ্গলে ৭৫ টি হোটেল রিসোর্ট রয়েছে। তারমধ্যে কারো কারো শতাধিক কর্মচারি রয়েছে। আমাদের রিসোর্টে রয়েছে ২৯ জন। আনুমানিক ১ হাজার মানুষ শুধু রিসোর্টেই কাজ করে। পর্যটকদের কারণে একটি ছোট পানের দোকান থেকে সিএনজি চালক সবাই লাভবান হচ্ছে। আবার যখন এই সিএনজিটা মেরামত হচ্ছে সেটার যে যন্ত্রংশ ক্রয় করছে বা গাড়ি মেরামত করছে সেওতো লাভবান হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি চালকসহ সব মিলিয়ে পর্যটনের কারণে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার মানুষের। এদের সবার পরিবার রয়েছে।

পর্যটক কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে কতো টাকা লেনদেন হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন পর্যটক ২ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ করেন। বছরে অন্তত ৪ লাখ পর্যটক আসেন। শ্রীমঙ্গলে ৫০০ টাকায় থাকা যায় এমন হোটেলের পাশাপাশি তারকা হোটেলও রয়েছে। সব মিলিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা এই খাত থেকেই শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

শ্রীমঙ্গলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা একটি জরিপ করেছিলাম তাতে প্রতিদিন আশেপাশের এলাকা এবং দূরদূরান্ত থেকে ৫ হাজার পর্যটক শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে আসার তথ্য পেয়েছি। এইসব পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি। যদি কোন কারণে ৬ মাস পর্যটক এখানে না আসে তা হলে কৃষিপণ্য অবিক্রিত থাকবে ৪০%। লেবু আনারস, চাপাতাসহ বিভিন্ন কৃষি পন্যের ৪০% সরাসরি ক্রয় করেন পর্যটকরা। পর্যটকদের কারণে সরাসরি প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। যার সুবিধাভোগী তাদের পরিবার ও প্রতিবেশী কয়েকলাখ মানুষ। চা পাতার দোকান, মনিপুরি হস্ত শিল্পসহ অনেক ব্যবসা আছে যার ৯৯% গ্রাহক পর্যটকরা।

তিনি আরও বলেন, এখন আমাদের প্লান পর্যটনের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন। পর্যটকরা যেনো সরাসরি কৃষকের থেকে পণ্র কিনতে পারেন মধ্যে কোন মধ্যসত্ত্বভোগী না থাকে সে পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। ২০৩০ সালের ভেতর শ্রীমঙ্গলে পর্যটক বর্তমানের ৩গুণ বৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করছি।

ইউএনও বলেন, আমাদের যে পরিকল্পনা রয়েছে তাতে নৃ-ত্বাত্তিকগোষ্টীর বিভিন্ন পন্য সরাসরি পর্যটকদের হাতে যাবে এতে তাদেরকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেবে। যদিও এখনই তারা বিভিন্ন ভাবে সুবিধা পাচ্ছেন তবে আমরা সে ক্ষেত্রটা আরেকটু বড় করতে চাইছি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com