1. b_f_haque70@yahoo.com : admin2021 :
  2. editor@cholojaai.net : cholo jaai : cholo jaai
ঘুরে আসুন নীল সাগরের সেন্ট মার্টিন
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১২ পূর্বাহ্ন

ঘুরে আসুন নীল সাগরের সেন্ট মার্টিন

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত  দেশের একমাত্র এবং সারা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মায়ানমার উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে।

কথিত আছে, প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরণ করেছিল জিঞ্জিরা।  এরা চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাতায়াতের সময় এই দ্বীপটিতে বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতো। কালক্রমে চট্টগ্রাম এবং তৎসংলগ্ন মানুষ এইদ্বীপটিকে জিঞ্জিরা নামেই চিনতো।

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দ্বীপের বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরাছিল মূলত মৎস্যজীবী। যতদূর জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসাবে এখানে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। এরা বেছে নিয়েছিল এই দ্বীপের উত্তরাংশ।

কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। আগে থেকেই এই দ্বীপে কেওড়া এবং ঝাউগাছ ছিল। সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ঠএবং ক্লান্তি দূরীকরণের অবলম্বন হিসাবে প্রচুর পরিমাণ নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করেছিল। কালক্রমে পুরো দ্বীপটি একসময় ‘নারকেল গাছপ্রধান’ দ্বীপে পরিণত হয়।একারণে, স্থানীয় অধিবাসীরা এই দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলে

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দেরদিকে ব্রিটিশ ভূ-জরীপ দল এই দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসাবে গ্রহণ করে। জরীপে এরা স্থানীয় নামের পরিবর্তে খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে সেন্ট মার্টিন নাম প্রদান করে। এরপর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের বাইরের মানুষের কাছে, দ্বীপটি সেন্ট মার্টিন নামেই পরিচিত লাভ করে।

এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে সাগর বক্ষের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ সেন্টমার্টিন। চারদিকে নীল পানির সমুদ্র। ছোট্ট এই দ্বীপের আয়তন ১৭ বর্গ কিলোমিটার। টেকনাফ থেকে ট্রলারে লঞ্চে কিংবা জাহাজে যেতে লাগে দুই থেকে সোয়া দুই ঘণ্টা।

এর জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। অধিবাসীদের প্রায় সবারই পেশা মৎস্য শিকার। তবে, প্রচুর  নারিকেল আর অল্প কিছু পেঁয়াজ, মরিচ, টমেটো ধান এই দ্বীপের প্রধান কৃষিজাত পণ্য। তবে ইদানীং পর্যটন শিল্পের বিকাশের কারণে অনেকেই রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল কিংবা গ্রোসারি শপের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের মানুষ নিতান্ত সহজ-সরল। তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। স্বল্প খরচে পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

কি আছে এখানে

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১শ ৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১শ ৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১শ ৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ,২শ ৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১শ ২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত Sea weeds বা অ্যালগি (Algae) এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্ট মার্টিন্সে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি (Red Algae) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়।

এছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। অমেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্যাসী শিল কাঁকড়া,লবস্টার ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল,রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ,উড়ুক্কু মাছ ইত্যাদি।  সামুদ্রিক কচ্ছপ সবজু সাগর কিাছিম এবং জলপাই রং সাগর কাছিম প্রজাতির ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে জায়গাটি খ্যাত।

দ্বীপে কেওড়া বন ছাড়া প্রাকৃতিক বন বলতে যা বোঝায় তা নেই। তবে দ্বীপের দক্ষিণ দিকে প্রচুর পরিমাণে কেওড়ার ঝোপ-ঝাড় আছে। দক্ষিণ দিকে কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে। অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে কেয়া, শ্যাওড়া, সাগরলতা, বাইন গাছ ইত্যাদি। তবে, সেন্ট মার্টিন থেকে আপনি যদি ছেড়া দ্বীপে যান তবে, দূর থেকে দেখতে পারেন চারদিকে নীল পানির মধ্যে দাড়িয়ে আছে একটুকরো সবুজ বন। এটি না দেখলে আপনি বুঝবেন না কত মনোরম নেই দৃশ্য।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে বাসে করে টেকনাফ যাওয়া যাবে। ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদে টেকনাফের বাস পাওয়া যায়। ঈগল, মডার্ন লাইন, এস আলম, শ্যামলী, সেন্ট মার্টিন পরিবহণ, দেশ ট্রাভেলস ইত্যাদি বাস টেকনাফ যায়।  ১০-১৩ ঘণ্টা লাগে পৌঁছাতে। চট্টগ্রাম ও কক্স-বাজার থেকে নিয়মিত বাস পাওয়া যায় টেকনাফ এর উদ্দেশে। কক্স-বাজার থেকে মাইক্রো বাস ভাড়া করেও টেকনাফ যাওয়া যায়।
টেকনাফের জাহাজ ঘাটে গিয়ে আপনাকে সীট্রাকের টিকেট কাটতে হবে। ভাড়া ৪৫০-৫৫০ টাকা (ফেরতসহ)। টেকনাফ হতে সেন্টমার্টিনের দুরত্ব ৯ কিমি। উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যেতে হয় এখানে। শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকে তাই এই সময় এখানে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। এই পর্যটন মৌসুমে এখানে টেকনাফ হতে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত এলসিটি কুতুবদিয়া, ঈগল ও কেয়ারী সিন্দবাদ সহ বেশ কয়েকটি সী-ট্রাক চলাচল করে। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই নৌযানগুলো সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং বিকাল ৩ টায় ফিরে আসে।
 মুলত টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত সমুদ্র পথটিতেই হবে আপনার রোমাঞ্চের শুরু। আপনি যেখন জাহাজে উঠলেন আর জাহাজগুলো ছাড়লো তখণ আপনার জাহাজের পিছু নেবে হাজার হাজার সামুদ্রিক পাখি। তারা কেন এই জাহাজারে পিছে পিছে ছুটে আপনি না গেলে বুঝবেন না।
এরপর আপনি আরো এগোতে থাকলে দেখবেন  কুলহীন কিনারাহীন সমুদ্রে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। যেতে যেতে এসসময় দেখবেন সমুদ্রের পানি ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে নীল পানি আর একদিকে ঘোলা পানি।এরপর নীল পানির সমুদ্রের সৌন্দর্য আপনাকে ভুলিয়ে দিতে পারে সব কিছু।
সি ট্রাক ছাড়া ট্রলার ও স্পীড বোটে করে যাওয়া যায় সেন্ট মার্টন। সী ট্রাক গুলো এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলাচল করে। এর পর বৈরি আবহাওয়ার কারণে প্রশাসন একে চলতে দেয় না। তবে যারা বৈরি মৌসুমে এডভেঞ্চার হিসেবে যেতে চান সেন্টমার্টিন তারা ট্রলার ভাড়া করে যেতে পারেন। তবে এই যাত্রাটি খুব একটা নিরাপদ নয়।
সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটে না, তবে ঘটে যেতে পারে। তাই সাবধান। কিন্তু উত্তাল সাগরের প্রকৃত রূপ দেখা কিংবা নির্জন দ্বীপে বসে বৃষ্টিস্নান করার লোভ যারা সামলাতে না পারেন তাদের জন্য ট্রলার ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই, ৮০০ টাকায় ট্রলার ভাড়া করা যাবে অথবা প্রতি জন ১০০ টাকা করে ভাড়া দিয়েও যাওয়া যাবে।

থাকবেন কোথায়; কি খাবেন

সেন্টমার্টিনের আসল মজা উপভোগ করতে হলে  আপনাকে অবশ্যই একটি রাত যাপন করতে হবে সেখানে।  ভাল হয় দুইরাত থাকলে। সেক্ষেত্রে ১টা দিন ছেড়া দ্বীপের জন্য, আরেকটা দিন সেন্টমার্টিনের জন্য বরাদ্দ রাখতে পারবেন। রাতটা দ্বীপে থাকলে রিসোর্টের বাইরে বেরুতে হবে যখন “ডেইলী প্যাসেঞ্জার” অর্থাৎ দিনে যেয়ে দিনে ফিরে আসা ট্যুরিস্টরা ফিরে যাবে তখ ন মনে হবে পুরো  দ্বীপটিই আপনার। শীতের সিজনে ভির বেশি থাকে।  সেসময় থাকার জন্য হোটেল পেতে একটু বেগ পেতে হয়। তারপরও সব শ্রেণীর মানুষের থাকামত হোটেল আছে এখানে।
১) ব্লু মেরিন
২) প্রাসাদ প্যারাডাইস
৩) অবকাশ
৪) সমুদ্র বিলাস
৫) নীল দিগন্ত রিসোর্ট
 এসব রিসোর্ট ছাড়াও ছোট ছোট আরো হোটেল আছে থাকার মত। খাবারের ব্যবস্থা তারাই করবে আপনি অর্ডার করলে। চাইলে আপিন বাইরে খেতে পারেন নানারকম খাবার। এখানে সেখানে সমুদ্রের তাজা মাছ এনে ফ্রাই করে বিক্রি করছেন অনেকে। চাইলে খেতে পারেন সেখানে।

বিদ্যুৎ নেই;. তবে ভয় নেই

সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুত এর সংযোগ নেই। পুরোটাই জেনারেটর নির্ভর। রিসোর্ট-হোটেলগুলো সন্ধ্যা থেকে সাধারণত রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত জেনারেটর চালায়। দিনের বেলায় পানির পাম্প ছাড়ার জন্য কিছুটা সময় চালু রাখতে পারে। শীতকালে ফ্যান লাগে না বলে দিনে বিদ্যুতের অভাব টের পাওয়াও যায় না।
তবে, ঝামেলা হয় মোবাইল, ক্যামেরা ল্যাপটপ এসব চার্জ করা নিয়ে । রাতের বেলা জেটি অর্থাত জাহাজ ঘাটে সারি সারি রেস্টুরেন্টের আলো-ঝলমলে পরিবেশে মনেই হয় না দ্বীপে কারেন্ট নাই। এরা অনেক রাত অবধি জেনারেটর  চালু রাখে। এখানে হোটেলের বাইরে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হরেক রকমের জ্যান্ত মাছ থেকে বেছে নিয়ে অর্ডার দিতে পারবেন। রূপচান্দা ছাড়াও টেকচান্দা আর কালাচান্দা পাওয়া যায়।
দ্বীপের কয়েক জায়গা বিশেষ করে পশ্চিম বীচ থেকে সাইকেল ভাড়া নেওয়া যায় ঘন্টা প্রতি ৬০-৭০টাকায়। তবে এসব সাইকেলের ব্রেক নাই, বেলও নাই। বীচ ধরে ঘুরতে পারবেন কিন্তু দ্বীপের সরু রাস্তায় ভ্যানের সাথে চলতে পারবেন না।
সবশেষ সেন্ট মার্টিন থেকে ফেরার পথে কিনে নিতে পারেন পছন্দসই নানা প্রজাতির মাছের শুটকি। তবে, সেখানে দোকানে সাজিয়ে রাখা শুটকি দেখলেই আপনার মন ভরে যাবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com