গ্রামটির প্রতি ঘরেই চলে রঙিন সুতার খেলা

ঢাকাই জামদানির অন্যতম অঞ্চল নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলা। যা ঈসা খাঁর রাজধানী নামে পরিচিত ছিল। এই সোনারগাঁয়ের একটি গ্রামের নাম সিংরাব। এই গ্রামে এক সময় ৩০-৪০ পরিবারে জামদানি শাড়ি বুননের কাজ হতো। মাঝখানে প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে থাকলেও আবার সেই জামদানির আমেজ ফিরে এসেছে। শুরু হয়েছে ঘরে ঘরে সূক্ষ্ম কারিগরদের রঙিন সুতার খেলা।

সাদিপুর ইউনিয়নের সিংরাব গ্রামের মানুষগুলো বসে নেই। কাজ করে যাচ্ছেন যে যার মতো। গ্রামের এক তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো জড়িত জামদানি শাড়ির কাজে। যাদের অর্ধেকই নারী। অর্থাৎ জামদানি শাড়ি বুনে নারীরাও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। জামদানি শাড়ি বুনেন নবির হোসেন। গত ৪০ বছর ধরে শাড়ি বুনে আসলেও মাঝখানে তিনি ছিলেন রিকশাচালক।

তিনি বলেন, বিয়ের আগেই শাড়ি বুনছি ২০ বছর। বিয়ের পরে ৭ বছর। মাঝে শাড়ির দাম না থাকায় অটোরিকশা চালাইছিলাম। এহন আবার দাম বাড়ায় শুরু করছি।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা আমিরুদ্দিন প্রায় ২০ বছর মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন। এখন তিনি আবার জামদানি শাড়ি বোনা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলেও ছোটকালে শেখা কাজ ভুলতে পারি নাই। তাই আবার শুরু করছি।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ইউসুফ মিয়া বলেন, এক বছর আগেও জামদানির কাজ করতো মাত্র তিন-চারটা পরিবার। এখন আবার শুরু করেছে। এখন প্রায় ৩০টি পরিবার কাজ করছে।

জানা যায়, এই গ্রামের ইউসুফ মিয়ার বাবা ছবির উদ্দিনই প্রথম জামদানি শাড়ির কাজ নিয়ে আসেন। তারপর একে একে তার কাছ থেকে শিখতে থাকে গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারা। এই গ্রামের যারা কাজ করেন তারা ৬০-৮০ কাউন্টের সুতা নিয়ে কাজ করেন। জামদানি শাড়ি সাধারণত ২০০ কাউন্ট সুতা পর্যন্ত কাজ হয়। ২৫০ কাউন্টের সুতা হলে তাকে মসলিন বলে। সুতার কাউন্ট যতো বেশি হবে, সময় ততই মিহি ও দামি হবে। কারণ তখন সময় ও শ্রম বেশি লাগে। এই গ্রামের প্রায় সব শাড়ি বিক্রি হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জামদানি হাটে। যা প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। একটি শাড়ি ২জনে কাজ করলে ৩দিন লাগে উঠাতে। যার দাম ওঠে ৩৮০০ থেকে ৪০০০ পর্যন্ত। এভাবে এক পরিবারে ২জন কাজ করলে তাদের মাসে ৮-৯টি শাড়ি আসে। যাতে খরচ বাদ দিয়েও ৩০ হাজার টাকার মতো হাতে থাকে।

একটি শাড়ি বুনতে সময় লাগতে পারে ১৫দিন, ৩০ দিন এমনকি বছরখানেকও লাগতে পারে। তবে এই গ্রামের বাসিন্দা অধিকাংশ কাজ করেন ৩দিনে যা ওঠে। কারণ এই গ্রামে ভালো কোনো সূক্ষ্ম কারিগর নেই। তবে একই ইউনিয়নের বরগাঁও গ্রামে ২০০ কাউন্টের সুতার কাজ হয় বলে জানিয়েছেন তাঁতিরা। করোনা পরবর্তী সময়ে দেশের বাজারে জামদানি শাড়ির চাহিদা বাড়লে দাম বেড়ে যায়। তখন যারা আগে জামদানির কাজ করতো তারা অন্যান্য পেশা ছেড়ে দিয়ে আবার ফিরে আসে ঐতিহাসিক এই কারুশিল্পে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: