কর্মী সংকটে ইউরোপ: জার্মানির প্রেক্ষাপট

যোগ্য শ্রমিকের অভাবে ব্যপক অর্থনৈতিক চাপে পড়বে ইউরোপ এমনটাই আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা৷ সংকট কাটাতে ইউরোপের কয়েকটি দেশের মতো অভিবাসনের নিয়ম শিথিল করার পরিকল্পনা জার্মানির৷

গত কয়েক মাস ধরেই জার্মানিতে কর্মী সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে জার্মানির গণমাধ্যমগুলো৷ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা এসব প্রতিবেদনে কর্মী সংকটের কথা জানিয়েছেন৷ বার্লিনের গাড়ির এক যন্ত্রাংশ বিক্রেতা বলেন, ‘‘কেউ যদি আবেদন করে আমি আগামীকাল থেকেই তাকে আমার প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করতে বলব৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের উচিত বিশ্বের সব দেশের কর্মীদেরকে স্বাগত জানানো৷’’ তারা ইউরোপের কিনা সেটি বিবেচনায় না নিয়েই তাদেরকে জায়গা দেওয়া দরকার বলে মত তার৷

জার্মানির কর্মী সংকটের বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায়ও বেরিয়ে এসেছে৷ জার্মানির এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশটিতে প্রতিবছর চার লাখ যোগ্য শ্রমিক দরকার৷ অবশ্য এই জরিপটি করা হয়েছিল ইউক্রেনের শরণার্থীদের আসার আগে৷

দক্ষ লোকবলের খোঁজে 

জার্মানির কোলন শহরে অবস্থিত ইউরোজব কনলাল্টিং নামে একটি এজেন্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইয়েরোম লেকট৷ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্মীর খোঁজে তার এজেন্সিতে যোগাযোগ করে৷ ইয়েরোম লেকটের এজেন্সিটি প্রতিবছর দুইশ থেকে পাঁচশ কর্মী সরবরাহ করে৷

ইয়েরোম লেকট বলেন, ‘‘কোম্পনির পরিচালক থেকে শুরু করে শ্রমিক অর্থাৎ বিভিন্ন পেশার জন্যই আমাদের কাছে আসে৷ আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শুধু বিশেষজ্ঞের খোঁজে আমাদের কাছে আসত৷ কিন্তু এখন আমরা শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপক অর্থাৎ নানা ধরনের পেশাজীবী সরবরাহ করে থাকি৷’’

তবে তার মতে, ‘‘নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হতে লম্বা সময় লাগে৷ তিন মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হয়৷’’ তিনি এটিকে একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন৷

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন

চলমান পরিস্থিতিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও এসেছে অনেক পরিবর্তন৷ বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দিতে বর্তমানে জার্মানির প্রতিষ্ঠানগুলো ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকে৷ তবে এখানেও রয়েছে নানা জটিলতা৷

ইয়েরোম লেকট বলেন, ‘‘কোনো প্রার্থীর যদি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকে এবং মনে হয় যে এই প্রার্থী আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত তারপরও আপনাকে অনেক কিছু জানতে হবে৷ যেমন এই ব্যক্তি কীভাবে বাসা খুঁজে পাবে, কীভাবে নতুন পরিবেশে একীভূত হবে এমনকি কীভাবে প্রশাসনিক কাগজপত্র পূরণ করবে সে বিষয়েও মাঝে মাঝে সাহায্য করতে হয়৷’’

এদিকে জার্মান সরকারও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি কর্মী নিয়োগে উৎসাহিত করছে৷ কর্মসংস্থানমন্ত্রী হুবার্টুস হেইল জার্মান টেলিভেশনে প্রচারিত এক টকশোতে বলেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে দরকার উন্নত মানের প্রশিক্ষণ, নারীদের অংশগ্রহণ, যারা বিরতি নিয়েছেন তাদের কাজে ফেরত আসা এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটানো৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘তবে এসব কিছুর পরও আমাদের যোগ্য অভিবাসী দরকার৷ যোগ্য কর্মীর ঘাটতি চলতে থাকলে দেশের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে৷’’

উল্লেখ্য চাকরির সন্ধানে গত বছর ১৯ লাখ মানুষ জার্মানিতে এসেছেন৷ এর মধ্যে ১৬ লাখ এসেছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আর তিন লাখ এসেছেন ভারত ও বিভিন্ন বলকান রাষ্ট্র থেকে৷

কোন খাতে কত ঘাটতি

বিভিন্ন খাতে লোকবল প্রয়োজন জার্মানির৷ জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২২ সময়ে বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি কর্মী সংকট রয়েছে সমাজকর্মী খাতে৷ উল্লেখিত সময়ে এই খাতে ২০ হাজার ৫৭৮ জন কর্মীর ঘাটতি দেখা দেয়৷

তার পরের অবস্থানে রয়েছে কিন্ডারগার্টেন বা শিশুদের দেখাশোনা৷ এই খাতে মোট ঘাটতি ছিল ২০ হাজার ৪৬৬জন৷ বৃদ্ধদের দেখাশোনার জন্য মোট ঘাটতি ১৮ হাজার ২৭৯ জনের, ১৬ হাজার ৯৪৭জন ইলেকট্রিসিয়ানের ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং নার্সিং খাতে ১৬ হাজার ৮৩৯জন, হিটিং অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং টেকনিসিয়ান ১৪ হাজার ১৩৪জন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ১৩ হাজার ৬৩৮জন, ফিজিওথেরাপিস্ট ১২ হজার ৬০জন, গাড়ি প্রকৌশলী ১১ হাজার ৭৭১জন এবং পরিবহণ ও লজিস্টিক খাতে ১০ হাজার ৫৬২জন শ্রমিকের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে৷

অভিবাসী আইন সহজ করার চেষ্টা

শ্রমিক সংকটের মুখে ২০২০ সালে এ বিষয়ে আইন সংশোধন করে জার্মান সরকার৷ কেননা বিদ্যমান আইন বিদেশি কর্মীদের আকৃষ্ট করতে খুব একটা উপযোগী ছিল না৷ সরকারের মেইক ইট ইন জার্মানি নামের ওয়েব সাইটে বলা হয়, ‘‘নতুন আইনের ফলে বিদেশ থেকে কর্মী আনার আগে জার্মান বা ইউরোপীয় কেউ চাকরিটি করতে চায় কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন নেইা৷’’

এদিকে গত বছর ক্ষমতায় আসা এসপিডির নেতৃত্বাধীন সরকারও বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে মনোযোগ দেয়৷

এদিকে জার্মানিতে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে দেশটি৷ আবার বিদেশিদের জার্মানিতে এসে চাকরি খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়াকেও সহজ করতে চায় সরকার৷ কিছু কিছু চাকরির ক্ষেত্রে, যেমন তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ভাষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকারের৷ আগামী বছর আইনটি পাশের জন্য সংসদে উঠার কথা রয়েছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: