1. [email protected] : admin2021 :
  2. [email protected] : cholo jaai : cholo jaai
আমার দেখা কাবুল, কাবুলিওয়ালা ও আমরা
শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন

আমার দেখা কাবুল, কাবুলিওয়ালা ও আমরা

চলযাই ডেস্ক :
  • আপডেট সময় সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০২১

রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা গল্প পড়ে আমার আফগানদের সম্পর্কে তিনটি ধারণা হয়েছিল- তারা সুদের ব্যবসা করে, অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং খুন-খারাবিতে অভ্যস্ত। তেমনি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম শুনে বা পড়ে মনে হবে যে, তালেবান আফগানদের মতো খারাপ লোক মনে হয় আর কেউ নেই। বাস্তবতা এই যে, এসব অপপ্রচারের মাধ্যমে ওইসব লোক আসলে নিজেদের কুৎসিত চেহারাটাই আড়াল করার চেষ্টা করে।

আমি ১৯৭৯ সালে ডাক্তারি পড়ার জন্য সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় যাই। প্রথম তিন বছর ওই দেশের ইউরোপিয়ান অংশে এবং শেষ চার বছর এশিয়ান অংশে, তাজাকিস্তানের দুশানবেতে পড়াশোনা করি। তাজিকদের ভাষা ফার্সি এবং ওই জাতিগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ আফগানিস্তানেও বাস করে। আমাদের সাথে অনেক আফগান ছেলেমেয়েও পড়তো। এই দুই দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার ব্যবহার, সভ্যতা সংস্কৃতিতে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। আগে তাজিকদের কথা বলি। তারা খুবই অতিথিপরায়ণ। রমজান মাসে আমরা ছাত্র হোস্টেলে ইফতার করার সুযোগই পেতাম না। অর্থাৎ দাওয়াত লেগেই থাকত।

একবার আমার এক আরব সহপাঠী ও আমি তাজিক টিভিতে একটি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। পরদিন বাজারে এক ফল বিক্রেতা আমাদের দেখে বললেন যে, তিনি আমাদেরকে টিভিতে দেখেছেন বিশেষ করে আরবি ভাষায় কথা শুনে তিনি বেশ খুশি এবং আমাদেরকে তিনি সাথে সাথে এক কেজি আঙ্গুর উপহার দিলেন। একবার তাজিকিস্তানের মালভূমিতে অবস্থিত একটি দূরবর্তী গ্রাম দেখার সুযোগ হয়েছিল। আবার সেই আরব সহপাঠীকে পেয়ে তারা বেশ খুশি। তারা আমার প্রতি কিছুটা অভিমান করল যে, মুসলমান হয়েও আমি কেন আরবি ভাষা জানি না, অথচ রাশান ভাষায় কথা বলি। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি খাসি জবাই করলেন।

একটু পর বিভিন্ন খাবার আনতে লাগলেন সৈয়দ মোস্তফা আলী আব্দুর রহমানের (আফগান) মতো। অবশেষে বিখ্যাত তাজিক পোলাও দিয়ে আপ্যায়ন। বিদায় বেলায় ঘোড়ার একটি আস্ত রান আমাদেরকে উপহার দেয়া হলো যেন হোস্টেলে এসে আমরা খেতে পারি। আমাদের এক আফগান বন্ধু ছিল যে ঘোড়ার মাংস পছন্দ করত না আবার মাছও খেতে পারত না। সেই সন্ধ্যায় আমি মাছ রান্না করি। তখন সেই বন্ধু দুঃখ করে ফার্সিতে বলল, ‘জামিন শাক্ত, আসমান দূর আস্ত’- অর্থ হচ্ছে জমিন শক্ত আকাশও দূরে। অর্থাৎ মাছ বা মাংস কোনোটাই তার খাওয়ার উপায় নেই। আমাদের সাথে পশতুন, তাজিক, হাজারা, বিভিন্ন আফগান ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করত।

তাদের মধ্যে কোনো দিন ঝগড়া হতে দেখিনি। অথচ আমরা বাংলাদেশীরা বিদেশে গিয়েও এক ভাষা এক কৃষ্টি হওয়ার পরও মিলেমিশে থাকতে পারি না। জার্মানিতে এক শহরে বাংলাদেশীরা দুটি মসজিদ বানাল। কেউ কারো মসজিদে যায় না। একসাথে মিটিং করতে গেলেও ঝগড়া লেগে যায়। যাই হোক আফগান ছাত্রছাত্রীরা ছিল অমায়িক, বন্ধুবৎসল ও পড়াশোনায় যথেষ্ট মনযোগী। হোস্টেলের করিডোরে কারো সাথে দেখা হলেই বলত, ‘চলো আমার রুমে, চা খাবে’। অথচ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে আমার সিনিয়র কয়েকজন বাঙালি ভাইয়ের রুমে যখন দেখা করতে গেলাম, একজন মন্তব্য করলেন, এটা আবার কে এলো? এই হচ্ছে আমাদের আথিতেয়তার নমুনা।

ওই সময় আফগানিস্তান ছিল পুরোপুরি সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে। আমাদের কলেজের মর্গে প্রায়ই রাশান সৈনিকদের লাশ আনা হতো ড্রেসিংয়ের জন্য। প্রত্যেকের মাথায় থাকত গুলির চিহ্ন। কারণ জিজ্ঞেস করায় টিচার বললেন, আফগানদের নিশানা খুবই নিখুঁত। আরমার্ড ক্যারিয়ারে হেলমেট পরিহিত সৈনিকদের মাথা যেটুকু বাইরে থাকে তাতেই তারা অব্যর্থ গুলি করতে পারে। অবশেষে এক ছুটিতে কাবুল দেখার সুযোগ হলো। কাবুল এয়ারপোর্টে নেমে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম হোটেলে যাওয়ার জন্য। পুলিশ হস্তক্ষেপ করল। ট্যাক্সিওয়ালাকে বলল, তারা মেহমান, তাদের কাছে বেশি ভাড়া চাওয়া হয়েছে। ট্যাক্সিওয়ালা বলল, সে দূর থেকে খালি ট্যাক্সি নিয়ে এসেছে। আমরা কি আমাদের এয়ারপোর্টে এরকম দৃশ্য চিন্তা করতে পারি? ইমিগ্রেশন ও মাল খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, ট্যাক্সিওয়ালাদের টানাটানিতেই আমাদের দেশের সার্বিক চিত্র ফুটে ওঠে। ভুলে যদি কোনো বিদেশী ট্যাক্সিতে চড়ে বসেন তাহলে ছিনতাইকারী বা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়বে না এ নিশ্চয়তা কে দেবে? কাবুলে ভাঙা-ভাঙা ফার্সি, ইংরেজি, উর্দু মিলে লোকজনের সাথে ভাব বিনিময় করতাম। যখন শুনত আমি রাশিয়াতে (তাজাকিস্তান) থাকি, তখন রেগে যেত, বলত, কেন কমিউনিস্ট দেশে থাকি। দখলদার হিসেবে রাশানদের প্রতি ছিল তাদের প্রচণ্ড ঘৃণা, প্রতিশোধস্পৃহা। তখন আমিও মুসলিম এ বলে তাদেরকে ঠাণ্ডা করতাম। কাবুলের যেকোনো সাধারণ হোটেলের খাবারও ছিল ভেজালমুক্ত। আমাদের মতো শাক-সবজি, ফল-মূলে কেমিক্যাল দেয়ার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না।

আফগানরা স্বাধীনচেতা বীরের জাতি। আফগানিস্তানকে বড় বড় সাম্রাজ্যের কবরস্থান বলা হয়। বলা হয়, আফগানিস্তানে সহজে ঢোকা যায়, তবে বের হওয়া বেশ কঠিন। ব্রিটিশরা বড় কোনো সেনাবাহিনী ছাড়াই ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করেছিল। অথচ আফগানদের সাথে তিনটি যুদ্ধে ব্রিটিশদের দুঃখজনক পরিণতি হয়েছিল। প্রথম যুদ্ধে কাবুল থেকে ১৬ হাজার সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সময় খুব কমসংখ্যক জীবিত অবস্থায় ভারতে ফেরত আসতে পেরেছিল। সোভিয়েত রাশিয়া দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর দখলদারিত্বের সময় আফগানিস্তানে চরম নৃশংসতার পরিচয় দেয়। তাদের হাতে ১০ লাখের মতো লোক নিহত হয়, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করে প্রায় ৪২ লাখ লোক, ৫০ লাখ লোক পাকিস্তান ও ইরানে আশ্রয় নেয়। কমিউনিস্টরা আফগানিস্তানের বন, সেচব্যবস্থা ধ্বংস করে এবং এক থেকে দেড় কোটি স্থলমাইন পুঁতে রাখে। তারপরও তারা আফগান মুজাহিদদের কাছে হেরে যায়। অবশেষে সোভিয়েত রাশিয়া নিজেই ভেঙে পড়ে।

এরপর আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর তালেবানদের উত্থান হয়। ২০০১ সালে আফগানিস্তান দখলের পর আমেরিকানরা তালেবানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। দীর্ঘ ২০ বছর তালেবানরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশকে দখলমুক্ত করে। কিন্তু এত কিছুর পরও তারা আমেরিকানদের ক্ষমা করে দিয়েছে। এরকম উদাহরণ রাসূল সা: মক্কা বিজয়ের সময় এবং সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী জেরুসালেম পুনরুদ্ধারের সময় স্থাপন করেছিলেন। তাদের আত্মত্যাগ পৃথিবীর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা যারা তালেবান আফগানদের সমালোচনা করি, আমাদের জাতিসত্তা সম্বন্ধে বিদেশীদের কী ধারণা তা-ও জানা দরকার। মি. বাক্সটার ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দীর্ঘদিন বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। তার মূল্যায়ন হচ্ছে, এ জাতি যুগে যুগে বিদেশীদের দ্বারা সহজে পরাজিত হয়েছে। যেমন শাহজালাল রহ:, বখতিয়ার খিলজি ও লর্ড ক্লাইভের বিজয়।

লর্ড ম্যাকলে ছিলেন ব্রিটিশ আমলে বাঙালিদের ওপর বিশেষজ্ঞ। প্রায় ১০০ বছর আগে আমাদের সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘সিংহের যেমন থাবা, ষাঁড়ের যেমন শিং, মৌমাছির যেমন হুল, তেমনি বাঙালিদের প্রধান অস্ত্র প্রতারণা। লম্বা-চওড়া কথা, সামান্য ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে শতগুণ করা শুধু বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য শুধু নয়, আত্মরক্ষার উপায়ও। আজ এত বছর পরও আমাদের প্রধান অস্ত্র ‘প্রতারণার’ প্রয়োগ দেখতে পাবেন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসায়, রাজনীতি, শেয়ারবাজার, অজ্ঞান পার্টিসহ সমাজের সর্বক্ষেত্রে। আর প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই আমাদের প্রভাবশালী লোকদের সেই লম্বা চওড়া কথার নমুনা দেখতে পাবেন। কাজেই আমাদের মুখে আফগান বীর যোদ্ধাদের সমালোচনা করা সম্ভবত শোভা পায় না।

লেখক : মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2020 cholojaai.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com