স্পেন

স্পেনের সরকারী নাম “কিংডম অফ স্পেন”। দেশটি দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের ইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত। স্পেন পশ্চিম দিকে পর্তুগাল এবং উত্তর-পূর্ব দিকে ফ্রান্স ও অ্যান্ডোরার সঙ্গে সংলগ্ন। দেশটির উত্তরে বিস্কায়া উপসাগর, দক্ষিণ দিকে জিব্রাল্টার প্রণালী, প্রণালীর দক্ষিণে মরক্কো, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগর অবস্থিত। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভূমধ্যসাগর। স্পেনের সমুদ্র সীমা প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ।

সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার পরে স্পেন ইউরোপের সবচেয়ে বেশি পর্বতসংকুল দেশ। স্পেনের প্রস্তরনির্মিত দুর্গপ্রাসাদ, বরফাবৃত পর্বতমালা, বিশালাকার সৌধ এবং আধুনিক ও পরিশীলিত শহরগুলির গল্প মুখে মুখে ফেরে। দেশটি তাই পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থল। স্পেন ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ একটি দেশ। স্পেনের গ্রামাঞ্চল আকর্ষণীয় সব দুর্গবেষ্টিত প্রাসাদ, প্রাচীন জল সরবরাহের নালা এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে পরিপূর্ণ, কিন্তু একইসাথে এর শহরগুলি সন্দেহাতীতভাবে অত্যন্ত আধুনিক।

১। স্পেনের প্রথম দিকের আধিবাসীরা মূলত কেল্ট ও আইবেরিয়রা। মধ্যযুগের প্রথমদিকে এটি জার্মান শাসনাধীনে গেলেও পরবর্তীকালে মুসলিমগণ দেশটি জয় করেন। শুরু হয় মুসলিম শাসন অবসানের জন্য উত্তরের খ্রিস্টান রাজ্যসমূহের এক এলোমেলো এবং অত্যন্ত দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া। অবশেষে সফল হয় খ্রিস্টানরা। ১৪৯২ সালে, কলম্বাস যখন অজানা দ্বীপ আমেরিকায় পৌঁছেন, তখন মুসলিম শাসনের শেষ চিহ্নটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নতুন সাম্রাজ্য স্পেনকে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করে এবং ১৬শ শতাব্দী থেকে ১৭শ শতাব্দীর অর্ধভাগ পর্যন্ত স্পেন ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রধান পরাশক্তি।

এর পরের ৩০০ বছর স্পেনের বিশ্বজয় অব্যাহত ছিল। এ সময় বাণিজ্যে বিপুল অগ্রগতির কারণে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয় স্পেন। পরে অবশ্য কমতে শুরু করে স্পেনের প্রভাব-প্রতিপত্তি। স্পেনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আবারও শুরু হয় বিংশ শতাব্দী থেকে। এখন তারা বিশ্বের ১৫তম বড় অর্থনৈতিক শক্তি। ১৯৮৬ সালে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়।

২। পাঁচ লাখ ৫ হাজার ৯৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে প্রায় ৪ কোটি ৬৭ লাখ মানুষের বসবাস। আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ৫১তম দেশ।

৩। স্পেনের সরকারী ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ। স্পেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোকের মাতৃভাষা স্প্যানিশ। তবে আমেরিকাতে স্প্যানিশ ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা স্পেনের চাইতেও বেশি।

৪। দেশটিতে ৬৮ শতাংশ নাগরিক ক্যাথলিক খ্রিস্টান। এছাড়া এখানে ২৭ শতাংশ এমন মানুষ বসবাস করেন যারা কোন ধর্মেই বিশ্বাসী নয়।

৫। স্পেনের বৃহত্তম শহর এবং রাজধানী হচ্ছে মাদ্রিদ। এটি বহু শতাব্দী ধরে দেশটির আর্থিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

আর কাতালুনিয়ার রাজধানী হচ্ছে বার্সেলোনা। এটি স্পেনের ধর্মনিরপেক্ষ স্থাপত্য এবং নৌপরিবহন শিল্পের জন্য পরিচিত।

৬। স্পেন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম পর্যটক আকর্ষক দেশ।

৭। স্পেনের জাতীয় সংগীত একটু আলাদা। এই দেশের জাতীয় সংগীতে কোন বাক্য তথা শব্দ নেই। পুরটায় শুধুমাত্র মিউজিক।

৮। বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন লাইট হাউস স্পেনে অবস্থিত। এটি প্রথম শতকে তৈরি করা হয়েছিলো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটি আজ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়।

৯। স্পেনে যেকোনো ছেলে অথবা মেয়ে যেকোনো জায়গায় তাদের কাপড় খুলে চলাফেরা করতে পারেন। এই বিষয়টি সম্পর্কিত কোন আইন নেই দেশটিতে।

১০। প্রতি বছরের আগস্ট মাসে স্পেনে একটি উৎসব পালন করা হয়। যেখানে একে অপরের দিকে শতশত হাজার হাজার টমেটো ছুড়ে মারা হয়। প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ কেজি টমেটো এই উৎসবে ব্যাবহার করা হয়।

১১। ইউনাইটেড কিংডম এর একটি গবেষণা অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ সবচেয়ে বেশি বুড়ো মানুষ স্পেনে থাকবে।

১২। স্পেনে প্রচুর বার রয়েছে। ২০১৫ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী দেশটিতে ২ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বার অবস্থিত।

১৩। স্পেনের মানুষদের কার কেনা একটি বড় শখ। এখানকার মানুষ প্রতি বছর স্মার্টফোনের চেয়ে বেশি কার কিনে থাকে।

১৪। স্টেপলার কিন্তু এই স্পেনেই আবিষ্কৃত হয়।

১৫। স্পেনের কোন মেয়ের বয়স ১৬ বছর বা তার বেশি হয়ে গেলেই সে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যে কাওকে বিয়ে করতে পারে।

১৬। এই দেশে রাজকীয় পরিবারকে নিয়ে খারাপ কোন মন্তব্য করলে আপনার ২ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে।

১৭। বুল ফাইটিং এর জন্য স্পেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই খেলায় অনেক সময় মানুষের প্রান পর্যন্ত চলে যায়।

১৮। স্পেনে একটি ৪৭ তালা বিল্ডিং রয়েছে যেটিতে কোন লিফট নেই। বুঝুন অবস্থা!

১৯। স্পেন ১ম এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি।

২০। পড়াশোনার জন্য ইউরোপে যেতে চাইলে, স্পেন সম্ভবতঃ আপনাকে সবচেয়ে বড় হৃদয় নিয়ে অভ্যর্থনা জানাবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার মান ও পরিবেশের দিক দিয়ে এগিয়ে আছে স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরাও বাইরে পড়াশোনার ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় প্রথমেই রাখে স্পেনকে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন (আইআইই) এর দেওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শিক্ষার্থী বাইরে পড়ছে, তাদের নয় শতাংশই পড়ে স্পেনে।

স্পেনের যেকোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে একবছরে খরচ পড়বে এক হাজার ইউরো। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেবল রেজিস্ট্রেশন ও টিউশন ফি পরিশোধ করতে হয়। মোট খরচ নির্ভর করবে কোর্স ও এর ক্রেডিটমূল্যের উপর। ব্যাচেলর ডিগ্রীর জন্য (বছরে ১৮০ ক্রেডিট বা ৬০ ক্রেডিট) প্রতি শিক্ষাবর্ষে পরিশোধ করতে হবে ৫০০-১১২০ ইউরো। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাচেলর ডিগ্রীর রেজিস্ট্রেশন ফি শিক্ষাবর্ষ প্রতি ৫০০০-১২০০০ হাজার ইউরো।

২১। স্পেনের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হচ্ছে ইউরো।

২২। দেশটির মোট জিডিপি ১.৫০৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৩২ হাজার ৫৫৯ মার্কিন ডলার।

২৩। স্পেনের ডায়ালিং কোড হচ্ছে +৩৪।

খালিদ হাসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: