সুন্দরবনে কয়েকদিন

‘কাছে এসো, সংগঠনের ব্যানারে ‘ট্যুর বাংলা’র আয়োজনে আমরা ক’জন ষাটোর্ধ যুবা ঢাকা শহর থেকে মাঝে মধ্যেই বেড়িয়ে পরি। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আমাদের বিচরণ। কিন্তু সহজেই তো আর সংসার থেকে ছুটি মেলে না। আমরা এখনো সংসারের হাল ধরে আছি। উপরন্ত অসুখ-বিসুখ পিছু লেগে আছে। তবে কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। কয়েকবার তারিখ পরিবর্তন করে একদিন ঠিকই বেরিয়ে পড়ি উদ্দিষ্ট গন্তব্যের পথে।
রেল ভ্রমণেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। কিন্তু রেলের ‘কালো বিড়াল’ সেই যাত্রাকেই প্রায়শই বিঘিœত করে। সড়ক পথের উন্নয়ন হয়েছে যথেষ্ট। প্রচুর সংখ্যক বাস প্রতিদিনই ঢাকার বাইরে যায়। কিন্তু অসহনীয় যানজট ভ্রমণের আনন্দকে মাটি করে দেয়। তাই আমরা চেষ্টা করি রেলে ভ্রমণ করার জন্য।
আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল বিশ^ ঐতিহ্য সুন্দরবন। সাব্যস্ত হলো আমরা ট্রেনে খুলনা গিয়ে সেখান থেকে সুন্দরবন যাবো। প্রায় বছর খানেক তারিখ বদল হতে হতে অবশেষে এলো সেই মাহেন্দক্ষণ। ৫ মার্চ অগ্রিম কাটা টিকিট নিয়ে সকাল বেলা আমরা কমলাপুর রেল স্টেশনে উপস্থিত হলাম। গিয়েই শুনি ট্রেন দেড় ঘন্টা লেট। দমে গেলাম না। দীর্ঘ দিনের রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় হাড্ডি আমাদের শক্ত-পোক্ত। ধৈর্য হারালে চলবে কেনো? ছয়টার গাড়ি ৯টায় ছাড়লেই আমরা খুশি।
অবশেষে প্রায় ২ ঘন্টা লেটে ট্রেন ছাড়লো। দেখা গেলো, হেলাল সাহেব, বাতেন সাহেব, খালেক সাহেব এবং আমি কামড়ায় উপস্থিত হলেও অবশিষ্ট দু’জন নেই। প্রায়ই এমনটি হয়। জীবন যুুুুুুুুুুুুুুুুুুুদ্ধের চড়াই-উৎরাই পার হয়ে অনেকেই ভ্রমণের ট্রেন মিস করেন।
জয়দেবপুর পর্যন্ত ট্রেন চললো একেবারেই মন্থর গতিতে। অনেকটা কচ্ছপের মতো। বিনা নোটিশে যেখানে সেখানে ট্রেন থেমে যাচ্ছিল। বিমান বন্দর স্টেশনে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত আওয়াজ ও ধাক্কা-ধাক্কি শুরু হলো। যত নামে তার চেয়ে বেশি যাত্রী উঠতে চাচ্ছে। অধিকাংশই বিনা টিকিটের যাত্রী। ডিউটিরত টিটি এবং পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এলেন। বড় মোলায়েম তাদের ব্যবহার। আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল না। বিনা টিকিটের যাত্রীদের সঙ্গে চলতে থাকলো দেন-দরবার। ওদিকে বাড়তি যাত্রীর চাপে টিকিটধারী যাত্রীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। জয়দেবপুর স্টেশনে গিয়ে ট্রেন একেবারে খালাশ। আমরা আপাতত হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। ট্রেন আবারো ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। এখনো টিকে থাকা গাজিপুরের গজারি বন পাড়ি দিয়ে ট্রেন যেনো গতি ফিরে পেলো। দ্রুত গতি নয়-তবে গতিময়। মনে হচ্ছিল স্বাভাবিক গতিতে চলতে না পেরে এই যান্ত্রিক বস্তুটি আমাদের মতোই তিতি-বিরক্ত।

‘সুন্দরবন এক্সপ্রেস’ ঝক্ ঝকে তক তকে ব্রডগেজ ট্রেন এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু সেতুর দিকে। আমরা জানালার বাইরে দৃষ্টি দিলাম। মনে হলো এখনো খানিকটা টিকে আছে প্রাচীন বাংলার রূপ-দু’পাশের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ,নদী-খাল অবারিত প্রান্তর,গৃহস্থের বাড়ি-ঘর,গাছপালা, বন-বিথি,কৃষান কৃষাণী বউ-ঝিদের কর্ম কোলাহল। সবকিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুটে চলছে ট্রেন। দু’চোখ ভরে দেখছি আর প্রাণ ভরে উপভোগ করছি দু’পাশের ছেড়ে যাওয়া দৃশ্য। এই তো আমার বাংলা, এই তো আমার জন্মভূমি- এর তুলনা কোথায়?
বাস দ্রুত গতিতে পার হলেও ট্রেন যমুনা সেতু পার হচ্ছে অত্যন্ত ধীর গতিতে- সময় লাগবে ২০মিনিট। মনে আছে আগে উত্তরবঙ্গ যেতে হলে আরিচা-নগরবাড়ি হয়ে ফেরিতে যেতে হতো। পদ্মা-যমুনার বিশাল জলরাশি ঠেলে কমছে কম সময় লাগতো ৫ঘন্টা। দুপুরের খাবার ফেরিতেই খেতে হতো। এখনো মনে পড়ে, হোটেল বয় বিরাট ফেরির বিভিন্ন তলায় ঘুরে ঘুরে ছড়া কেটে খাওয়ার আহ্বান জানাতো। ‘খাইবেন নি ভাই চিকন চালের গরম ভাত, পাঙ্গাস মাছ-মুরগির গোছ।’ অনেক সময় আরিচা ঘাটে ফেরি ভিড়তে দেরি হলে খোলা আকাশের নিচে ঘাটে বসেই খেয়ে নিতে হতো। তাজা ইলিশ মাছ অথবা অত্যন্ত ঝাল পাঙ্গাস মাছের বড় বড় টুকরো দিয়ে গরম ভাত খাওয়ার স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে।
তবে উত্তরবঙ্গ যেতে কষ্টের সীমা পরিসীমা ছিল না। কখনো কখানো বগুড়া পৌঁছাতেই রাত ১০টা বেজে যেতো। দেশের সর্ববৃহৎ বঙ্গবন্ধু বহুমুখি যমুনা সেতু উন্নয়নের একটি বড় মাইল ফলক। এই সেতু উত্তরবঙ্গের মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধন করেছে। সেখানকার কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য দিনে দিনেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করতে পারছে। ফলে তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষও এই সেতু ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছে। বাস এবং ট্রেন একই সঙ্গে পাশাপাশি চলে এই সেতুতে। সেতুর দুই পাড়ে নদী শাসনে যে বনায়ন সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেছে এখানে। অনেকেই এখানে আসেন অবকাশ যাপনের জন্য।
তবে কষ্ট হয় নদীর দিকে তাকালে। বহুদিন আগেই প্রাচীন ব্রক্ষ্মপুত্রের নবরূপ যমুনা তার যৌবন হারিয়েছে। ট্রেন থেকে উত্তর দিকে তাকালে দেখা যায় ছোট-বড় অসংখ্য চর। ‘যে নদী হারায়েমো শ্রোত চলিতে না পারে, সহ¯্র শৈবাল ধাম বাধি আসে তারে’- বিগত যৌবনা যমুনা নদীকে দেখে আমার এই কবিতার কথাই বারবার মনে পড়ছিল। কোথায় গেলো খরশ্রোতা যমুনা নদী। আর কোথায়ই বা গেলে সুস্বাদু পাঙ্গাস মাছ। তবে সান্তনা এটুকুই যে আশে পাশে কল-কারখানা গড়ে না উঠায় যমুনার জল এখনো তার স্বচ্ছতা ধরে রেখেছে। শীতের শেষের হাল্কা কুয়াশায় আচ্ছন্ন যমুনার মোহনীয় রূপ আমাদের চোখকে কিছুটা হলেও তৃপ্তি দিলো এটাই বা কম কিসে? মনে পড়ে গেলো, লোক কবির গাঁথা-‘যমুনার জল দেখতে কালো/ প্রেম করিতে লাগে ভালো, যৌবন মিশিয়া গেলো জলে।’ তবে সে ভাব জগতে ছেঁদ পড়তে বেশিক্ষণ দেরি হলো না। ট্রেন অর্ধেক পার হতে না হতেই দু’পাশের বিস্তীর্ণ বালুকা রাশি নদীর পশ্চিম পার গ্রাস করলো। বুঝা গেলো আর একটি বিরাট চর সেতুর একেবারে নীচেই জেগে উঠেছে। দেখতে দেখতে দু’পাশের বনবীথির ফাঁক গলে আমরা পশ্চিম পাড়ে গিয়ে পৌঁছলাম। (চলবে)

মো: জহুরুল হক ভূইয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: