মলদোভাঃ ইউরোপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ

মলদোভার সরকারী নাম “রিপাবলিক অফ মলদোভা”। এটি পূর্ব ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এর পশ্চিমে রোমানিয়া এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে ইউক্রেন অবস্থিত। দেশটি ইউরোপের বলকান অঞ্চলের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এর বেশিরভাগ অংশ বিখ্যাত প্রাট এবং নিস্টার নদীর মাঝখানে অবস্থিত।

মলদোভা ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র দেশ, যার অর্থনীতি মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল এবং গোটা ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে এদেশেই সর্বনিম্ন মানব উন্নয়ন সূচক বিদ্যমান। একইসাথে পর্যটনের দিক দিয়ে এটি ইউরোপের সবচেয়ে কম পরিদর্শন করা একটি দেশ। এখানে প্রতি বছর গড়ে মাত্র ১১,০০০ বিদেশী পর্যটক ঘুরতে আসেন। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো অতটা না হলেও মলদোভাও কিন্তু যথেষ্ট সুন্দর একটি দেশ।

তাহলে চলুন, মলদোভা দেশ সম্পর্কে আরো কিছু জানা-অজানা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

১। মলদোভা নামটি মলদোভা নদীর নাম থেকে উদ্ভূত। ঐতিহাসিকভাবে এটি মলদোভা রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। এটি ১৮১২ সালে রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। রুশ সাম্রাজ্যের পতনের পর এটি ১৯১৮ সালে রোমানিয়ার সাথে সংযুক্ত হয়। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশটি ১৯৯১ সালের ২৭শে আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

২। ৩৩ হাজার ৮৪৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিতে ২৬ লাখ ৮১ হাজার মানুষের বসবাস। আয়তনের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১৩৫ তম দেশ।

৩। মলদোভীয় ভাষা বা রোমানীয় ভাষা মলদোভার সরকারী ভাষা এবং এটিতে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কথা বলেন। এছাড়া রুশ ভাষাতে প্রায় ১২ শতাংশ লোক কথা বলেন এবং ভাষাটিকে আন্তঃসাম্প্রদায়িক যোগাযোগের ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

৪। দেশটির প্রধান ধর্ম হচ্ছে খ্রিস্টধর্ম। দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী। দেশটিতে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ নেই বললেই চলে।

৫। কিশিনেউ মলদোভার রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর। মলদোভার ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত শহরটি একাধারে দেশটির প্রধান শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র। শহরটি দনিস্টার নদীর একটি উপনদী বিক নদীর তীরে অবস্থিত। শহরটি অর্থনৈতিক ভাবে মলদোভার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর। এছাড়াও এটি দেশটির বৃহত্তম পরিবহন ও যোগাযোগ কেন্দ্র।

৬। দেশটিতে মধ্যম মহাদেশীয় জলবায়ু বিদ্যমান। এখানে গ্রীষ্মকাল উষ্ণ এবং দীর্ঘ হয়, গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা শীতকালে গিয়ে দাঁড়ায় -৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসে।

৭। মলদোভার রাজনীতি একটি একক সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। ১৯৯৪ সালে রচিত সংবিধানের আলোকে দেশটির সরকার কাঠামো নির্ধারিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান হলেন দেশটির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা গ্রহনের পরে একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, যিনি দেশটির সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

৮। দেশটির পরিবহনব্যবস্থা মূলত রেল এবং সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। মলদোভার একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হল রাজধানী কিশিনেউ তে অবস্থিত কিশিনেউ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

৯। মলদোভায় একটি সু-প্রতিষ্ঠিত ওয়াইন শিল্প রয়েছে। এবং দেশের বেশিরভাগ ওয়াইন রফতানির জন্য তৈরি হয়। অতীতে এর প্রধান রপ্তানি বাজার ছিল রাশিয়া, দেশটির উৎপাদিত প্রায় ৯০ শতাংশ ওয়াইন রাশিয়ায় রপ্তানি করা হতো। তবে ২০০৬ সালে একটি কূটনৈতিক বিরোধের ফলে রাশিয়াতে মলদোভান এবং জর্জিয়ান পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়। ফলস্বরূপ দেশটির অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের মুখে। তবুও ওয়াইন উৎপাদনের দিক দিয়ে মলদোভা এখনও বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম দেশ।

১০। ২০১২ সালে, প্রায় তিন বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরে, মলদোভার প্রবীণ বিচারক নিকোলি টিমোফ্টি রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মানে হচ্ছে দেশটিতে প্রায় ৩ বছর ধরে কোন রাষ্ট্রপতি ছিল না।

১১। বেশিরভাগ মলদোভিয়ান কমপক্ষে ২টি ভাষাতে কথা বলতে পারেন। হয় তারা তাদের স্থানীয় ভাষা রোমানিয়ান এ কথা বলেন অথবা রাশিয়ান বা গেগাউজে কথা বলেন। অনেকেই তিনটি ভাষাতেই সমান পারদর্শী।

১২। এরা বিশ্বের ২য় বৃহত্তম নেশাতুর জাতি। বেলারুশিয়ানদের পরে, মোল্দাভিয়ানরা বিশ্বের সর্বাধিক অ্যালকোহল গ্রহণ করে। দেশটিতে একজন মানুষ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৭ লিটার মদ খেয়ে থাকে।

incoming.tatrabis.md

১৩। বিশ্বের বৃহত্তম বোতল-আকারের বিল্ডিং এই মলডোভাতেই রয়েছে। তিরনাওকো গ্রামে অবস্থিত, স্ট্রং ড্রিংকস মিউজিয়ামটি একটি বড় বোতলের মতো, এটিই বিশ্বের এই ধরণের বৃহত্তম আকারের স্থাপনা।

১৪। দেশটিতে একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল আছে। ট্রান্সনিস্টরিয়া নামে পরিচিত অঞ্চলটি ১৯৯০ সালে মোল্দাভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, এবং এরাই এই অঞ্চলের স্বাধীনতার জন্য ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার যুদ্ধের সূচনা করে। তবে, এই অঞ্চলটি যাদের নিজস্ব মুদ্রা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, এরা জাতিসংঘের কোনও সদস্য দেশ দ্বারা স্বীকৃত নয়।

১৫। মলদোভা পুরোপুরি ভাবে একটি স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ার কারনে টেকনিক্যালি এর কোন সৈকত নেই। তবে দেশটির রাজধানীতে অবস্থিত কিশিনেউ লেকে কিছুটা বালুকাবেলা রয়েছে। তবে, যদিও এটি মনুষ্যসৃষ্ট সৈকত কিন্তু এর পাড়ে শুয়ে বা বসে থেকে আপনি অনায়াসেই সমুদ্রের মজা পাবেন। যতটা পাওয়া যায় আরকি।

১৬। মলদোভাকে পাখি প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য বলাই যায়। দেশটিতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির ভিন্ন ধরণের পাখি দেখতে পাওয়া যায়।

১৭। যেমনটি ভিডিওর শুরুতেই বলেছি, মলদোভা ইউরোপের গরীব দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জিডিপি পার ক্যাপিটা অনুযায়ী এটি শুধুমাত্র আরেক ইউরোপীয় দেশ ইউক্রেনের ওপরে রয়েছে।

১৮। মলদোভার সরকারী মুদ্রা লেয়ু। ১ লেয়ু সমান প্রায় বাংলাদেশী ২০ টাকা এবং ১৭ ভারতীয় রুপি।

১৯। দেশটির মোট জিডিপি $১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবং মাথাপিছু আয় মাত্র $৩,৩০০ মার্কিন ডলার।

২০। মলদোভার ডায়ালিং কোড হচ্ছে +৩৭৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: